গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে, নতুন সমঝোতায় চ্যালেঞ্জ কী
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১০ PM
শেয়ার
সংবাদটি শুনুনAI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে, নতুন সমঝোতায় চ্যালেঞ্জ কী.
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। এর আগেই নতুন চুক্তি করতে চায় ঢাকা। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ৮ অক্টোবর জানিয়েছেন, দুই দেশ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ের আগে সমঝোতা সম্পন্ন হবে বলে সরকার আশাবাদী। তবে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি।নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চায় ঢাকা। এ জন্য ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো পানির নিশ্চয়তামূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের নিয়ম নির্ধারণ করা হয় এ চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়। তাই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।পানির নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশএবারের আলোচনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তামূলক ধারা যুক্ত করা। পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানী জানিয়েছেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এ ধরনের ধারা ছিল। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে তা রাখা হয়নি।নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির হিস্যা সুরক্ষিত করতে চায় ঢাকা। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে বন্যা, কৃষি ও অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়, তা মোকাবিলার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ।যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনাভারতের অবস্থান হলো, অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে আলোচনা হবে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিসহ অভিন্ন নদী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়।বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। তবে আলোচনা চলার অর্থ এই নয় যে নতুন চুক্তির শর্ত, মেয়াদ কিংবা পানির পরিমাণ নিয়ে দুই দেশ চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছেছে।সমঝোতার পথে যেসব চ্যালেঞ্জনতুন চুক্তি করতে দুই দেশের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের নির্ধারিত হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের পানির চাহিদা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং কৃষি ও পরিবেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে।এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পানিবণ্টন ব্যবস্থাকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাও জরুরি। এসব বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পানির তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।কৃষি ও জীবিকায় প্রভাবগঙ্গার পানির সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকা জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পেলে সেচব্যবস্থা ও নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে পানিপ্রবাহের অনিয়ম কৃষি ও স্থানীয় অবকাঠামোয় প্রভাব ফেলতে পারে।তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে নদীর প্রকৃত পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, স্থানীয় পানিব্যবস্থাপনা এবং নতুন চুক্তির শর্তের ওপর। তাই নতুন চুক্তির সুফল মূল্যায়নে শুধু কূটনৈতিক ঘোষণা নয়, বাস্তব পানিপ্রবাহ ও চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও গুরুত্বগঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতা বাংলাদেশ ও ভারতের সামগ্রিক সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই বিষয়ে কার্যকর সমাধান দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। তবে পানি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই আলোচনার ফল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে এমন একটি চুক্তি নিশ্চিত করা, যাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির হিস্যা, পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।ভারতের সঙ্গে আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত। নতুন সমঝোতার সাফল্য নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতে দর-কষাকষি এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের ওপর।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। এর আগেই নতুন চুক্তি করতে চায় ঢাকা। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ৮ অক্টোবর জানিয়েছেন, দুই দেশ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ের আগে সমঝোতা সম্পন্ন হবে বলে সরকার আশাবাদী। তবে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি।
নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চায় ঢাকা। এ জন্য ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো পানির নিশ্চয়তামূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের নিয়ম নির্ধারণ করা হয় এ চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়। তাই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পানির নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ
এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তামূলক ধারা যুক্ত করা। পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানী জানিয়েছেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এ ধরনের ধারা ছিল। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে তা রাখা হয়নি।
নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির হিস্যা সুরক্ষিত করতে চায় ঢাকা। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে বন্যা, কৃষি ও অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়, তা মোকাবিলার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ।
যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা
ভারতের অবস্থান হলো, অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে আলোচনা হবে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিসহ অভিন্ন নদী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। তবে আলোচনা চলার অর্থ এই নয় যে নতুন চুক্তির শর্ত, মেয়াদ কিংবা পানির পরিমাণ নিয়ে দুই দেশ চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
সমঝোতার পথে যেসব চ্যালেঞ্জ
নতুন চুক্তি করতে দুই দেশের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের নির্ধারিত হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের পানির চাহিদা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং কৃষি ও পরিবেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পানিবণ্টন ব্যবস্থাকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাও জরুরি। এসব বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পানির তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কৃষি ও জীবিকায় প্রভাব
গঙ্গার পানির সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকা জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পেলে সেচব্যবস্থা ও নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে পানিপ্রবাহের অনিয়ম কৃষি ও স্থানীয় অবকাঠামোয় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে নদীর প্রকৃত পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, স্থানীয় পানিব্যবস্থাপনা এবং নতুন চুক্তির শর্তের ওপর। তাই নতুন চুক্তির সুফল মূল্যায়নে শুধু কূটনৈতিক ঘোষণা নয়, বাস্তব পানিপ্রবাহ ও চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও গুরুত্ব
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতা বাংলাদেশ ও ভারতের সামগ্রিক সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই বিষয়ে কার্যকর সমাধান দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। তবে পানি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই আলোচনার ফল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে এমন একটি চুক্তি নিশ্চিত করা, যাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির হিস্যা, পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ভারতের সঙ্গে আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত। নতুন সমঝোতার সাফল্য নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতে দর-কষাকষি এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের ওপর।