গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে, নতুন সমঝোতায় বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত
সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি
মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ AM
শেয়ার
সংবাদটি শুনুনAI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে, নতুন সমঝোতায় বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত.
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়ন করতে চায় না বাংলাদেশ। ঢাকা নতুন একটি চুক্তি চায়। এতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থাও রাখতে চায় বাংলাদেশ।১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তিন দশক পর সেই কাঠামো নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, উজানে পানির চাহিদা এবং বাংলাদেশের নিম্ন অববাহিকায় কৃষি ও পরিবেশের ওপর চাপ বেড়েছে।এবার বাংলাদেশের অবস্থানও আগের তুলনায় স্পষ্ট। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালের চুক্তি শুধু নবায়ন করতে চায় না। নতুন চুক্তিতে একটি গ্যারান্টি ক্লজ রাখতে চায় ঢাকা।এই ক্লজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি-অর্থনীতির ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা রাখতে চায় বাংলাদেশ।ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করা হবে। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে নতুন চুক্তির চূড়ান্ত কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি।এখন বড় প্রশ্ন হলো, পুরোনো চুক্তির কিছু ধারা সংশোধন করে সেটিই রাখা হবে, নাকি পরিবর্তিত জলবায়ু ও নদীর প্রবাহ বিবেচনায় সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে।১৯৯৬ সালের চুক্তি ৩০ বছর আগে যে জলপ্রবাহ ও পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতা তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। তাই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি পানির নিশ্চয়তা, পরিবেশগত প্রবাহ ও বন্যা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।নতুন চুক্তির প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকায়।শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচ ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি এলে বাড়তে পারে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি।তাই ঢাকার প্রস্তাবিত গ্যারান্টি ক্লজের লক্ষ্য শুধু নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়া নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে পানির প্রবাহকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করাও এর উদ্দেশ্য।অন্যদিকে ভারতের জন্যও বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে সংবেদনশীল। গঙ্গা অববাহিকায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কৃষি, পানীয় জল ও অন্যান্য চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হবে।৩ অক্টোবর বাংলাদেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানান, ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।একই সময়ে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের কমিটি প্রস্তুত। এখন ভারতীয় পক্ষের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার লক্ষ্য এমন একটি ফলাফল নিশ্চিত করা, যাতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়।এ কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনা দুই দেশের পানি কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে শুষ্ক মৌসুমে নির্ভরযোগ্য পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা, বর্ষায় অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা।অন্যদিকে ভারতের সামনে থাকবে বাংলাদেশের দাবি, নিজস্ব রাজ্যগুলোর পানির চাহিদা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বয় তৈরির বিষয়টি।১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই প্রশ্নটি সামনে আসছে—দুই দেশ কি ১৯৯৬ সালের কাঠামো শুধু নবায়ন করবে, নাকি আগামী কয়েক দশকের জন্য নতুন একটি পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করবে?প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, আলোচনা চলছে। তবে নতুন চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত এখনো নির্ধারিত হয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারিগরি আলোচনা কীভাবে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নেয় এবং সেই সমঝোতায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হয়।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়ন করতে চায় না বাংলাদেশ। ঢাকা নতুন একটি চুক্তি চায়। এতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থাও রাখতে চায় বাংলাদেশ।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তিন দশক পর সেই কাঠামো নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, উজানে পানির চাহিদা এবং বাংলাদেশের নিম্ন অববাহিকায় কৃষি ও পরিবেশের ওপর চাপ বেড়েছে।
এবার বাংলাদেশের অবস্থানও আগের তুলনায় স্পষ্ট। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালের চুক্তি শুধু নবায়ন করতে চায় না। নতুন চুক্তিতে একটি গ্যারান্টি ক্লজ রাখতে চায় ঢাকা।
এই ক্লজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি-অর্থনীতির ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা রাখতে চায় বাংলাদেশ।
ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করা হবে। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে নতুন চুক্তির চূড়ান্ত কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, পুরোনো চুক্তির কিছু ধারা সংশোধন করে সেটিই রাখা হবে, নাকি পরিবর্তিত জলবায়ু ও নদীর প্রবাহ বিবেচনায় সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে।
১৯৯৬ সালের চুক্তি ৩০ বছর আগে যে জলপ্রবাহ ও পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতা তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। তাই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি পানির নিশ্চয়তা, পরিবেশগত প্রবাহ ও বন্যা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন চুক্তির প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকায়।
শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচ ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি এলে বাড়তে পারে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি।
তাই ঢাকার প্রস্তাবিত গ্যারান্টি ক্লজের লক্ষ্য শুধু নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়া নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে পানির প্রবাহকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করাও এর উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে সংবেদনশীল। গঙ্গা অববাহিকায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কৃষি, পানীয় জল ও অন্যান্য চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
৩ অক্টোবর বাংলাদেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানান, ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের কমিটি প্রস্তুত। এখন ভারতীয় পক্ষের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার লক্ষ্য এমন একটি ফলাফল নিশ্চিত করা, যাতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়।
এ কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনা দুই দেশের পানি কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে শুষ্ক মৌসুমে নির্ভরযোগ্য পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা, বর্ষায় অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
অন্যদিকে ভারতের সামনে থাকবে বাংলাদেশের দাবি, নিজস্ব রাজ্যগুলোর পানির চাহিদা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বয় তৈরির বিষয়টি।
১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই প্রশ্নটি সামনে আসছে—দুই দেশ কি ১৯৯৬ সালের কাঠামো শুধু নবায়ন করবে, নাকি আগামী কয়েক দশকের জন্য নতুন একটি পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করবে?
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, আলোচনা চলছে। তবে নতুন চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত এখনো নির্ধারিত হয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারিগরি আলোচনা কীভাবে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নেয় এবং সেই সমঝোতায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হয়।