বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত পরীক্ষার ফল, জিপিএ, পাসের হার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতাকে সামনে রাখি। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য—একজন জ্ঞানমনস্ক, দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা, সেটি অনেক সময় আলোচনার আড়ালে পড়ে যায়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, অর্থনীতি এগিয়ে নেবে, গবেষণা করবে, প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তাই শিক্ষা কেবল একটি ব্যক্তির ক্যারিয়ার গড়ার মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রগতির ভিত্তি। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—আমরা কি সত্যিই দক্ষ ও যোগ্য প্রজন্ম তৈরি করছি, নাকি শুধু সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছি?
দেশে শিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে বেড়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সনদ অর্জন করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর তাঁদের একটি বড় অংশকে দেখা যায় প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতিতে ভুগতে। অন্যদিকে শিল্প, ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়োগদাতারা উপযুক্ত দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছেন না। এই বৈপরীত্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। একজন শিক্ষার্থী কী শিখল, কতটা বুঝল কিংবা বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করতে পারবে—তার চেয়ে পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। ফলে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর এই সংস্কৃতি শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষা। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হলে অভিভাবকেরা বাড়তি অর্থ ব্যয় করে সন্তানকে কোচিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে পাঠাতে বাধ্য হন। এতে শিক্ষার ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানদের জন্য বৈষম্যও তৈরি হয়। শিক্ষা তখন আর সমান সুযোগের বিষয় থাকে না; সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বিশ্বের কর্মক্ষেত্রও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, রোবোটিকস, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্রচলিত অনেক কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীদের জানতে হবে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে হয়, কীভাবে একটি সমস্যা বিশ্লেষণ করে সমাধান বের করতে হয়, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে দলগতভাবে কাজ করতে হয়। যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা ও অভিযোজনের ক্ষমতাও এখন কর্মজীবনের অপরিহার্য দক্ষতা।
এ কারণে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী বের হওয়ার পর শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করলে হবে না; তাঁকে এমন দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাঁর চাহিদা তৈরি করবে। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করা।
এ ক্ষেত্রে কারিকুলাম সংস্কারের পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু লিখিত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থীর সক্ষমতা বিচার করা যথেষ্ট নয়। গবেষণা, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, উপস্থাপনা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, সমস্যা সমাধান ও দলগত কাজের মতো বিষয়কে মূল্যায়নের অংশ করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য নয়, বাস্তব জীবনের জন্য শেখার সুযোগ পাবে।
তবে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষা অবকাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করবেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা ও কৌতূহল জাগিয়ে তুলবেন—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
শিক্ষায় বৈষম্য দূর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান, প্রযুক্তিতে প্রবেশের অসমতা এবং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের পার্থক্য অনেক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে সীমিত করে। একটি মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে পড়বে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানসম্মত শিক্ষা সবার অধিকার।
শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক মূল্যবোধ। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠে না। নৈতিকতা, সহমর্মিতা, যুক্তিবোধ, দায়িত্বশীলতা, ইতিহাসচেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও শিক্ষার অপরিহার্য অংশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা দিতে পারলে তারা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তারা শুধু চাকরি খুঁজবে না; উদ্যোক্তা হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, গবেষণা করবে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রশ্নটি শুধু ‘কতজন পাস করল’—এতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জানতে হবে, কতজন শিক্ষার্থী বাস্তব দক্ষতা অর্জন করল, কতজন সমস্যা সমাধান করতে শিখল, কতজন নতুন কিছু তৈরি করতে পারল এবং কতজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল।
সনদ একজন মানুষকে শিক্ষিত হওয়ার পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু দক্ষতা তাকে কর্মক্ষেত্রে যোগ্য করে তোলে। তাই সনদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতার মানও বাড়াতে হবে। শিক্ষাকে পরীক্ষার খাতা ও সনদের গণ্ডি থেকে বের করে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার সমন্বিত পথে নিয়ে যেতে পারলেই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হবে।
লেখক: সাংবাদিক।