রবিবার|বাংলা: ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ|ইংরেজি: ১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ|আরবি: ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

কৃষক হারালে খাদ্য হারাব: এখনই কৃষিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে

কৃষক হারালে খাদ্য হারাব: এখনই কৃষিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ দেশের মাটি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে কৃষক ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করাই কঠিন। যুগের পর যুগ কৃষকের ঘামেই দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হয়েছে। অথচ আজ কৃষি পেশা ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই কৃষিকে আর সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে দেখছে না। অভিভাবকেরাও চান তাঁদের সন্তান চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হোক। ফলে কৃষক হওয়ার স্বপ্ন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো যদি সবাই চাকরি বা ব্যবসার পেছনে ছুটে যায়, তাহলে দেশের খাদ্য উৎপাদন করবে কে?

এটি শুধু একটি পেশা নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদাও। কিন্তু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ছে না; বরং নগরায়ন, শিল্পায়ন, সড়ক নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প এবং নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে কৃষিজমি ও কৃষকের সংখ্যা। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বর্তমানে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি ও ফলমূলসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর পেছনে বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব থাকলেও দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগ কৃষিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। প্রতিবছর অসংখ্য কৃষক ক্ষতির শিকার হন। অনেকেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হন।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা। কৃষক বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করলেও অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। কারণ কৃষিপণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না; মাঝখানে একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত হওয়ায় কৃষকের লাভ কমে যায়, অথচ ভোক্তাকে বেশি দাম গুনতে হয়। ফলে কৃষক যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে সরাসরি কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি উদ্যোগে কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র, কৃষক সমবায়, ডিজিটাল কৃষি বাজার, অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্ম এবং ন্যায্যমূল্যের বিক্রয়ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবেন।

খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি। অধিক ফলনের আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক। আবার খাদ্য সংরক্ষণ বা দ্রুত পাকানোর জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক কৃষিপদ্ধতির প্রসার, জৈব কৃষিতে উৎসাহ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।

তবে শুধু সমস্যার চিত্র তুলে ধরলেই হবে না; কার্যকর সমাধানের দিকেও নজর দিতে হবে।

প্রথমত, কৃষিকে লাভজনক পেশায় পরিণত করতে হবে। কৃষক যেন তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পান, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিবন্ধিত কৃষকদের জন্য কৃষিভাতা, কৃষি বীমা, দুর্যোগকালীন ক্ষতিপূরণ, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং স্বল্পসুদে সহজ ঋণের ব্যবস্থা চালু করা উচিত। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং নতুন প্রজন্মও কৃষিকে পেশা হিসেবে বিবেচনা করতে উৎসাহিত হবে।

তৃতীয়ত, কৃষিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। কৃষিযন্ত্র, ড্রোন, স্মার্ট সেচব্যবস্থা, উন্নত বীজ, ডিজিটাল তথ্যসেবা এবং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। আধুনিক কৃষি শুধু লাঙল ও গরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজ প্রযুক্তিনির্ভর একটি সম্ভাবনাময় শিল্প ও উদ্যোক্তা খাত।

চতুর্থত, শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজে ব্যবহারিক কৃষিশিক্ষা, কৃষি ক্লাব এবং তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কৃষিকে শুধু দরিদ্র মানুষের পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পঞ্চমত, যাঁদের বাড়িতে সামান্য খালি জায়গা রয়েছে, তাঁরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী শাকসবজি, ফল কিংবা মসলা চাষ করতে পারেন। শহরে ছাদকৃষি, গ্রামে পারিবারিক কৃষি এবং পতিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা প্রায়ই কৃষকের কষ্টের কথা বলি, কিন্তু তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কৃপণতা করি। অথচ কৃষক না থাকলে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিচারক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা কেউই তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষ দিয়ে কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না।

আজ যদি কৃষিকে অবহেলা করা হয়, কৃষকের মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত না করা হয় এবং নতুন প্রজন্মকে কৃষির প্রতি উৎসাহিত করা না হয়, তাহলে আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে দক্ষ কৃষকের সংকট আরও প্রকট হবে। তখন খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের আরও বাইরে চলে যাবে।

তাই এখনই সময় কৃষিকে শুধু একটি পেশা হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষকবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং কৃষক থেকে ভোক্তার সরাসরি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

আমরা যেন কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হই, যখন অর্থ থাকবে কিন্তু খাদ্য থাকবে না; বাজার থাকবে কিন্তু কৃষক থাকবে না।

মনে রাখতে হবে, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু উঁচু ভবন, আধুনিক সড়ক কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নয়; সেই দেশের মানুষের খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতায়। আর সেই সক্ষমতার মূল কারিগর আমাদের কৃষক।

কৃষককে বাঁচানো মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। কৃষিকে বাঁচানো মানেই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা। এখনই সময় কৃষিকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার।
নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
মসজিদের ভেতরে মুসল্লিকে হাঁসুয়া দিয়ে কুপিয়ে জখম

মসজিদের ভেতরে মুসল্লিকে হাঁসুয়া দিয়ে কুপিয়ে জখম

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

ঢাকা প্রোব ডেস্ক
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬