ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার খবর এসেছে। কোথাও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন, কোথাও আলোচনা সভা, আবার কোথাও সাংগঠনিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; এগুলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সহাবস্থানের বর্তমান বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, আদর্শিক বিতর্ক থাকবে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যখন যুক্তির পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক চরিত্র হারাতে শুরু করে। জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যাদের অধিকাংশই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষ নিজেদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলার শিকার বলে দাবি করেছে। ছাত্রদল অভিযোগ করছে, ছাত্রশিবির পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের এই চিত্র নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবারই যদি সত্য আড়ালে থেকে যায়, তবে সংঘাতের পুনরাবৃত্তি কীভাবে রোধ হবে?
ঘটনাগুলোর সময়ও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, তখন দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সংঘর্ষ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ একে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ বলছেন, আবার কেউ বৃহত্তর অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে কোনো ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র বা নির্দিষ্ট পক্ষের সম্পৃক্ততার দাবি প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এ ধরনের বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া উচিত।
উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, সংঘর্ষের পর আহতদের চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময়ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ভাঙচুর, হাসপাতাল পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; তদন্তের ফল দ্রুত প্রকাশ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছাত্রসমাজের অবদান ইতিহাসের অংশ। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করতে হলে ছাত্ররাজনীতিকে অবশ্যই সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্যের সমাধান হতে হবে যুক্তি, বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—লাঠিসোঁটা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া বা রক্তপাতের মাধ্যমে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেও সময়ের দাবি স্পষ্ট। প্রতিটি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা, সব ছাত্রসংগঠনের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের সহযোগী ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল বার্তা দিতে হবে। ক্যাম্পাসকে সংঘর্ষের ক্ষেত্র নয়, গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার দায় সবার।
রক্তাক্ত ক্যাম্পাস কখনোই কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তির প্রতীক হতে পারে না। বরং তা রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহাবস্থান, সংলাপ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি। তাই এখনই প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, বরং আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচানো মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নয়; ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে আরও গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও যুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার ভিত্তি রক্ষা করা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।