উত্তর ইথিওপিয়ার তিগ্রাইয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। একই সময়ে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। এতে হর্ন অব আফ্রিকায় বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৪ অক্টোবর ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা তিগ্রাইয়ের রাজধানী মেকেলে নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে এতে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সংঘাতের শুরু তিগ্রাইয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ থেকে। পরে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নেয়। ২৩ সেপ্টেম্বরের পর সরকারি বাহিনী ও TPLF-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়। সরকারি বাহিনী মেকেলের দিকে অগ্রসর হলে তিগ্রাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন সতর্ক করেছে, নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির অর্জন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
তিগ্রাইয়ের সংঘাতের পাশাপাশি ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ইথিওপিয়া অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া তিগ্রাইয়ের সশস্ত্র বিরোধীদের সহায়তা করছে। ইরিত্রিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
১ অক্টোবর ইথিওপিয়া আস্মারায় নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে। একই সঙ্গে ১০ ইরিত্রীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। এর পর ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
এতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক পথ আরও সংকুচিত হয়েছে।
তবে উত্তেজনার পেছনে শুধু তিগ্রাইয়ের সংঘাত নেই। লোহিত সাগরে ইথিওপিয়ার প্রবেশাধিকার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়া সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারকে জাতীয় স্বার্থের বিষয় হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার এই আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তিগ্রাইয়ের সংঘাত দুই দেশের পুরোনো অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
আঞ্চলিক বিরোধও জড়িয়ে পড়ছে
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে মিসর ও সুদানের সঙ্গে ইথিওপিয়ার টানাপোড়েন। ইথিওপিয়ার অভিযোগ, প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। মিসর ও ইরিত্রিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নীলনদের পানি ও গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নিয়েও মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
ফলে তিগ্রাইয়ের সংঘাত এখন একাধিক আঞ্চলিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
মেকেলে দখলেই কি সংঘাত শেষ
মেকেলে পুনর্দখল ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকারের জন্য সামরিক সাফল্য হলেও এটি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নয়।
TPLF নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা শহর থেকে সরে গেছে। আঞ্চলিক সরকারকেও সাময়িকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে একই ধরনের সামরিক পালাবদল দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল। তাই এখন শুধু মেকেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। তিগ্রাইয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবিক সংকটের আশঙ্কা
তিগ্রাইয়ের পরিস্থিতি মানবিক দিক থেকেও উদ্বেগ তৈরি করছে। ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। বিমান চলাচলও বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে।
সংঘাত দীর্ঘ হলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি হতে পারে। দেখা দিতে পারে খাদ্য ও জরুরি সহায়তার সংকট।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে সংঘাত বন্ধ করে রাজনৈতিক সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
নতুন যুদ্ধ কি আসন্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধকে অনিবার্য বলা যায় না। তবে তিগ্রাইয়ে লড়াই অব্যাহত থাকা, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া এবং লোহিত সাগর ও আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে পারস্পরিক অবিশ্বাস যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের এক বিশ্লেষণেও সতর্ক করা হয়েছে, তিগ্রাইয়ের সংঘাত ইথিওপিয়ার সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আফ্রিকান ইউনিয়ন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোও সংলাপের ওপর জোর দিচ্ছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে তিগ্রাইয়ে সামরিক অগ্রযাত্রা থামানো, ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করা গেলে বড় সংঘাত ঠেকানোর সুযোগ থাকতে পারে।
কিন্তু কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তিগ্রাইয়ের সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সুদান, লোহিত সাগর এবং পুরো হর্ন অব আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে।