চিরযৌবন ও সৌন্দর্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের বহু পুরোনো। বিশেষ করে নারীদের সৌন্দর্যচর্চা ঘিরে ইতিহাসে রয়েছে নানা বিস্ময়কর ঘটনা। সময়ের সঙ্গে সৌন্দর্যচর্চার ধরন বদলেছে, তবে অপ্রচলিত পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ এখনো রয়েছে।
ইতিহাসে সৌন্দর্য ধরে রাখার সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিতভাবে আলোচিত নামগুলোর একটি এলিজাবেথ ব্যাথরি। ‘ব্লাড কাউন্টেস’ বা ‘কাউন্টেস ড্রাকুলা’ নামে পরিচিত এই হাঙ্গেরীয় অভিজাত নারীকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা কিংবদন্তি। কথিত আছে, যৌবন ও সৌন্দর্য ধরে রাখার আশায় তিনি তরুণীদের রক্ত ব্যবহার করতেন। তবে এসব কাহিনির অনেকটাই ঐতিহাসিক বিতর্ক ও লোককথার অংশ; সব দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আধুনিক যুগেও সৌন্দর্য ও সুস্থতা নিয়ে নানা অপ্রচলিত চর্চা আলোচনায় আসে। এর মধ্যে রয়েছে সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল গ্রহণের প্রবণতা।
সন্তান জন্মের পর কিছু নারী প্লাসেন্টা শুকিয়ে ক্যাপসুল বানিয়ে গ্রহণ করেন। কেউ কেউ এটি স্মুদি বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গেও মিশিয়ে খান। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, এতে প্রসব-পরবর্তী ক্লান্তি কমে, মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে, বুকের দুধ উৎপাদন বাড়ে কিংবা ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
তবে এসব দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাসেন্টা খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে গবেষণা এখনো সীমিত। অপর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ বা সংরক্ষণের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের চর্চা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রকৃতিতে অবশ্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টা খেয়ে থাকে। গবেষকদের ধারণা, প্রসবের সময় হারানো শক্তি পুনরুদ্ধার এবং শিকারিদের দৃষ্টি এড়ানোর মতো কারণ এর পেছনে থাকতে পারে।
বিনোদন জগতের কয়েকজন তারকাও সন্তান জন্মের পর নিজেদের প্লাসেন্টা গ্রহণের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তাদের অভিজ্ঞতা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে।
কোর্টনি কার্দাশিয়ান
রিয়েলিটি তারকা কোর্টনি কার্দাশিয়ান সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা ক্যাপসুল আকারে গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্লাসেন্টা ক্যাপসুলের ছবি শেয়ার করে তিনি এর অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যও করেন।
তার বক্তব্যের পর প্লাসেন্টা ক্যাপসুল নিয়ে ভক্তদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।
জানুয়ারি জোন্স
হলিউড অভিনেত্রী জানুয়ারি জোন্স ২০১১ সালে পুত্রসন্তানের মা হন। সে সময় তিনি জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘ম্যাড মেন’-এ অভিনয় করছিলেন।
সন্তান জন্মের পর দ্রুত কাজে ফেরার ক্ষেত্রে নিজের প্লাসেন্টা গ্রহণ সহায়ক ছিল বলে মনে করেন জোন্স। তার এমন বক্তব্যও সে সময় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল।
অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোন
হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোনও সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন।
তিনি প্লাসেন্টা থেকে তৈরি ক্যাপসুলকে ‘হ্যাপি পিল’ বা সুখী বড়ি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার এই অভিজ্ঞতাও প্লাসেন্টা গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে আলোচনায় আসে।
ক্যাথরিন হেইগল
অভিনেত্রী ক্যাথরিন হেইগলও সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা ক্যাপসুল আকারে গ্রহণ করেছিলেন।
তার প্লাসেন্টা একটি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল, যারা সেটিকে প্রক্রিয়াজাত করে ক্যাপসুলে পরিণত করে। এরপর তিনি সেগুলো গ্রহণ করেন।
ম্যাথিউ ম্যাককনাঘি ও ক্যামিলা আলভেস
অস্কারজয়ী অভিনেতা ম্যাথিউ ম্যাককনাঘি ও তার স্ত্রী ক্যামিলা আলভেস অবশ্য প্লাসেন্টা ক্যাপসুল বা স্মুদি হিসেবে গ্রহণ করেননি।
তারা প্লাসেন্টা বাড়ির আঙিনায় একটি আমগাছের গোড়ায় সার হিসেবে ব্যবহার করেন। ম্যাথিউয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গাছে কয়েক বছর পর প্রথম আম ধরলে পরিবারের সবাই মিলে সেই আম খেয়েছিলেন।
বিজ্ঞান কী বলছে?
প্লাসেন্টা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে তারকাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকলেও সেটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত উপকারিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রসব-পরবর্তী শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, বুকের দুধ উৎপাদন বা ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে প্লাসেন্টা খাওয়ার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো নেই।
তাই সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ হিসেবে না দেখে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর যেকোনো ধরনের খাবার, ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।