নিজস্ব প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আমোদাবাদ গ্রামের কয়েকটি নিম্নআয়ের পরিবার প্রায় তিন দশক ধরে মাটির তৈরি ‘ছিকর’ বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই ছিকর দেখতে অনেকটা চারকোনা বিস্কুটের মতো। নির্মাতাদের দাবি, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মধ্যে এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
সম্প্রতি সরেজমিনে আমোদাবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে পলিথিনের ওপর সারি সারি করে রোদে শুকানো হচ্ছে আঙুলের মতো লম্বা, চারকোনা আকৃতির মাটির ছিকর। ঘরের ভেতরে একজন নারী এঁটেল মাটি মেখে খামির তৈরি করছেন, আরেকজন সেই খামির বটি দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কাটছেন। উঠানের এক পাশে চুলার মৃদু আঁচে মাটির হাঁড়িতে পোড়ানো হচ্ছে ছিকর। আগুনে পুড়ে এগুলোর রং কালচে হয়ে যায়।
গ্রামের বাসিন্দা রাজিয়া বেগম জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে এই কাজই তাঁর প্রধান অবলম্বন। তিনি সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ কেজি ছিকর তৈরি করেন। প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসে এসব ছিকর কিনে নিয়ে যান।
তিনি বলেন, প্রথমে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে ভালোভাবে মেখে খামির তৈরি করা হয়। এরপর দুই থেকে তিন ইঞ্চি লম্বা করে কেটে রোদে শুকানো হয়। সবশেষে চুলার হালকা আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে পুড়িয়ে ছিকর প্রস্তুত করা হয়। গর্ভবতী নারী ও শিশুরাই এটি বেশি কিনে থাকেন।
সাফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার চাচা শ্বশুরের কাছ থেকে ছিকর তৈরি শেখা। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে এই কাজ করছি। কিন্তু মাটি, জ্বালানি কাঠ ও শ্রমের তুলনায় যে দাম পাই, তা খুবই কম। ন্যায্য মূল্য পেলে আমাদের জন্য অনেক উপকার হতো।’
লাকী বেগম জানান, শাশুড়িকে সহযোগিতা করতে করতেই তিনি ছিকর তৈরি শিখেছেন। প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এ কাজ করছেন। সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে সপ্তাহে প্রায় ৪০ কেজি ছিকর তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় উৎপাদন ও বিক্রি—দুটোই কমে যায়। তারপরও এই আয় সংসারের ব্যয় নির্বাহে কিছুটা সহায়তা করে।
আখাউড়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আব্দুস সাত্তার মিয়া বলেন, আমোদাবাদ গ্রামের তিন থেকে চারটি দরিদ্র পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাটির ছিকর তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় তারা ন্যায্য মূল্য পায় না। তবুও জীবিকার তাগিদে তারা ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ধরে রেখেছেন।