ছবি ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
খেলার বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা ৯ বছরের শিশু জিদনীর। সহপাঠীদের সঙ্গে মাঠে ছুটে বেড়ানো, পড়াশোনা আর হাসি-আনন্দে কাটার কথা ছিল তার শৈশব। কিন্তু বিরল রোগের কারণে সেই স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়েছে শিশুটি। জন্মের পর থেকেই তার বাম হাত অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠতে শুরু করে। ধীরে ধীরে হাতটি বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে জিদনী ও তার পরিবারের।
জিদনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের তেরকান্দা গ্রামের ভ্যানচালক দানু মিয়ার দ্বিতীয় মেয়ে। জীবিকার তাগিদে স্ত্রী ও চার মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা চকলেট ফ্যাক্টরি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন দানু মিয়া। দিনভর ভ্যান চালিয়ে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসার। পরিবারের খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিবার ও চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিদনীর শরীরে ‘নিউরোফাইব্রোমাটোসিস’ (Neurofibromatosis) অথবা ‘ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন’ (Vascular Malformation)-এর মতো বিরল রোগের লক্ষণ দেখা গেছে। এসব রোগে স্নায়ু, ত্বক কিংবা রক্তনালির টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যেতে পারে এবং ধীরে ধীরে তা বড় আকার ধারণ করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে আক্রান্ত অঙ্গ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
দুই দফা অস্ত্রোপচারের পর থেমে গেছে চিকিৎসা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জিদনীর চিকিৎসার জন্য ২০১৮ সালে প্রথমবার ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার বাম হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়।
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা তিন মাস পর আবারও অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা আর করানো সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে দুই দফা অস্ত্রোপচার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনে পরিবারের প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবএইডে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যয়বহুল ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় জিদনীর।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, দ্রুত আরও দুই থেকে তিনটি অস্ত্রোপচার করা গেলে জিদনীর হাতটি রক্ষা করার সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপ শুরু করতেই প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু ভ্যানচালক বাবার পক্ষে এই বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
‘মেয়ের এই কষ্ট আর দেখতে পারছি না’
জিদনীর মা মুন্নী আক্তারের কণ্ঠে এখন হতাশা আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ‘মেয়ের চিকিৎসার জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার, সমাজসেবীসহ অনেকের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাইনি। টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটা স্কুলেও যেতে পারে না। তার হাত দেখে অন্য শিশুরা ভয় পায়। তাই ওর পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। একজন মা হিসেবে মেয়ের এই কষ্ট আর দেখতে পারছি না।’
বিরল রোগের কারণে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি স্বাভাবিক শৈশবও হারিয়েছে জিদনী। অন্য শিশুরা যখন স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন তাকে বেশির ভাগ সময় ঘরেই থাকতে হয়। নিজের অস্বাভাবিক হাতের কারণে মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এবং অন্য শিশুদের ভয় পাওয়ার বিষয়টিও তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয় বলে জানিয়েছে পরিবার।
ভ্যানচালক বাবা দানু মিয়ার এখন একটাই স্বপ্ন—মেয়েটি যেন চিকিৎসা নিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। অর্থের অভাবে যে চিকিৎসা থেমে গেছে, মানুষের সহযোগিতা পেলে সেটিই আবার শুরু করতে চান তিনি।
উন্নত চিকিৎসার জন্য সহায়তার আবেদন
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, ‘ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন একটি বিরল রোগ। এর চিকিৎসা আমাদের হাসপাতালে সম্ভব নয়। সম্ভব হলে জিদনীর অস্ত্রোপচার এখানেই বিনামূল্যে করা যেত এবং হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করা হতো।’
তিনি বলেন, এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুটির চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে।
জিদনীর পরিবার এখন সমাজের বিত্তবান, দানশীল ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মানবিক হৃদয়ের মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে। তাদের আশা, মানুষের সহায়তায় আবার শুরু হবে জিদনীর চিকিৎসা। ফিরবে তার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ, আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ খুলবে ৯ বছরের এই শিশুর।
সহায়তা পাঠানোর মাধ্যম:
দানু মিয়া
বিকাশ/নগদ (পার্সোনাল): ০১৭২২-১৯৬২৫৫