সোমবারবাংলা: ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দইংরেজি: ৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দহিজরি: ২২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

৪৫০ টাকার রাসায়নিকে তৈরি হচ্ছে ২,২০০ টাকার দুধ

৪৫০ টাকার রাসায়নিকে তৈরি হচ্ছে ২,২০০ টাকার দুধ
সংবাদটি শুনুন AI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন

পাবনার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডেইরি ফার্ম ও চিলিং সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে, এসবের আড়ালে কোথাও কোথাও তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার ও কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দুধের মতো সাদা তরল। পরে তা পৌঁছে যাচ্ছে চিলিং সেন্টার, স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন ক্রেতার কাছে।

এতে ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। অন্যদিকে কম দামের নকল দুধের কারণে বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত খামারিরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার। চিলিং সেন্টার হলো দুধের মান যাচাই ও প্রাথমিক সংরক্ষণের স্থান। এর মধ্যে ৯২টি বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির। বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। সাঁথিয়া, বাঘাবাড়ী ও বেড়া উপজেলাতেও রয়েছে অসংখ্য চিলিং সেন্টার।

বাঘাবাড়ী ঘাটকেন্দ্রিক এই বিস্তৃত অঞ্চল দেশের দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ও প্রকাশ্যে ভেজাল দুধ তৈরির কারবার চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভোর থেকে সকাল নয়টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এসব কার্যক্রম।

ধবধবে সাদা রং, ঘনত্ব ঠিকঠাক। চর্বির মাত্রাও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেখলে মনে হবে গাভির খাঁটি দুধ। কিন্তু অভিযোগ, এই সাদা তরল তৈরি হচ্ছে নানা রাসায়নিক মিশিয়ে। পরে তা বিক্রি হচ্ছে চিলিং সেন্টার, দুগ্ধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় হাটবাজারে।

প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব কারবারিকে জরিমানা করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জরিমানার পরিমাণ নকল দুধের ব্যবসা থেকে পাওয়া মুনাফার তুলনায় কম। ফলে কারবার বন্ধ হচ্ছে না।

৪০ লিটার নকল দুধে মুনাফা ১,৭৫০ টাকা

ভেজাল দুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা পানিতে প্রায় ৪৫০ টাকার রাসায়নিক মেশানো হয়। তাঁদের দাবি, এতে তৈরি হয় ‘উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধ’। পরে ৪০ লিটার দুধ প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। অর্থাৎ প্রতি ৪০ লিটারে মুনাফা থাকে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা।

এভাবে প্রতিদিন মণকে মণ নকল দুধ তৈরি করে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন কারবারিরা—এমন অভিযোগ রয়েছে।

কারবারিরা জানান, এসব রাসায়নিক অনলাইনে বা ফোনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনা যায়। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে তা পৌঁছে যায় কারখানায়।

নকল দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে চিলিং সেন্টারে সরবরাহের বিষয়টি জানতে চাইলে তাঁরা বিস্তারিত বলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কারবারি দাবি করেন, ৫০০ টাকা ঘুষ দিলে চিলিং সেন্টারে নকল দুধ ঢোকানো যায়। কম দামের কারণে কিছু স্থানীয় সংগ্রাহক জেনেশুনেই এসব দুধ কেনেন বলেও তাঁর দাবি।

অভিযানে জরিমানা

গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়ার পেচাকোলা ঘাট এলাকায় উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে প্রশাসন। এটি তাঁদের জীবনে প্রথম জরিমানা বলে জানা গেছে।

এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে বিভিন্ন কারণে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি ও প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ এবং ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

বেড়ার নাকালিয়া ও পেচাকোলা বাজারে ১২ বছর ধরে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে জয়দেব ঘোষকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

প্রকৃত খামারিরা বিপাকে

ভেজাল দুধের কারবারের কারণে প্রকৃত খামারিরাও বিপাকে পড়েছেন। খাঁটি দুধের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এবং ঘুষ না দেওয়ায় অনেক চিলিং সেন্টার তাঁদের দুধ কিনতে চায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন খামারিরা। তাঁদের দাবি, এই ব্যক্তিরা চিলিং সেন্টারে দুধ সংগ্রহ করে দেন। কমিশন না পেলে তাঁরা প্রকৃত খামারিদের কোণঠাসা করে রাখেন।

বাওইখোলা গ্রামের দুগ্ধ খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল দুধ তৈরি করে কম দামে বিক্রি করছেন। এতে খামারিদের দুধের বাজার নষ্ট হচ্ছে। প্রতি লিটার দুধ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না। এতে প্রকৃত খামারিরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

দুধের চাহিদার ঘাটতি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার

প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও দুগ্ধ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হয় সাড়ে তিন লাখ লিটার।

উৎপাদিত দুধের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ লিটার নেয় মিল্ক ভিটা। আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান নেয় প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার। পাইকার বা ঘোষেরা নেন ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার। দুই শতাধিক মিষ্টির দোকানে যায় প্রায় ১৫ হাজার লিটার। হাটবাজারের স্থানীয় ক্রেতারা কেনেন প্রায় ১০ হাজার লিটার।

এই হিসাবে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি থাকে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার। নকল দুধ তৈরি করে এই ঘাটতি পূরণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

চাটমোহরের রামনগর গ্রামের ডেইরি খামারি শাকিল হোসেন বলেন, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫৬ হাজার লিটার দুধ থেকে ছানা তৈরি করেন। ছানা ও ফ্যাট আলাদা করার পর ওই পরিমাণ দুধ থেকে প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ লিটার পর্যন্ত সাদা পানি পাওয়া যায়। এই পানি ফেলে না দিয়ে তাতে রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয় বলে তাঁর দাবি।

শাকিল হোসেন আরও বলেন, যারা ছানা বা ঘি তৈরি করেন, তাঁরা নকল দুধ কিনবেন না। মিষ্টির দোকানেও ভেজাল দুধ নেওয়ার সুযোগ কম। তাহলে হাজার হাজার লিটার নকল দুধ কোথায় যায়, সেই প্রশ্ন রয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, ঘোষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নকল দুধ সংগ্রহ করে কিছু অসাধু ব্যক্তি তা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পাঠান। সেখানে আসল ও নকল দুধ মিশিয়ে প্যাকেজিং করা হয়।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যও রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য

সাঁথিয়ার স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, প্রকৃত খামারিরা দুধে ভেজাল মেশান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ভেজাল দুধ সরবরাহ করেন। চিলিং সেন্টারে যথাযথভাবে মান যাচাই না করায় তাঁরা এই সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রাণ ডেইরির ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) সৈকত শেখ বলেন, প্রাণ ডেইরি শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে দুধ সংগ্রহ করে। ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এলএস মেশিনের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৪ ধাপে দুধ পরীক্ষা করা হয়। মানদণ্ডে না টিকলে বা সামান্যতম ভেজাল ধরা পড়লেও দুধ গ্রহণ করা হয় না।

তিনি বলেন, পরীক্ষায় ভেজাল ধরা পড়ার পর দুধ গ্রহণ না করায় গত এক বছরে অসাধু চক্রের হামলায় চিলিং সেন্টারের চার থেকে পাঁচজন কর্মী আহত হয়েছেন।

সৈকত শেখের মতে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান কড়াকড়ি করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিপণন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে সব দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অভিন্ন ও বাধ্যতামূলক ‘ফিক্সড এসওপি’ চালু করা প্রয়োজন।

মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক ডা. সাইদুল ইসলাম বলেন, মিল্ক ভিটার চিলিং সেন্টারে দুধ সংগ্রহের সময় প্রতিটি নমুনায় ফ্যাট, এসএনএফ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি আধুনিক প্রযুক্তিতে পরীক্ষা করা হয়। কোনো দুধে ভেজাল বা রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও ধ্বংস করা হয়।

তিনি বলেন, কিছু অসাধু ফড়িয়া চক্রের কারণে এই অঞ্চলের দুগ্ধ খাতের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

স্বাভাবিক পুষ্টিমান নকল করা সম্ভব নয়

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাকৃতিক দুধে উপাদানগুলোর স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। কৃত্রিমভাবে চর্বির মাত্রা নকল করা সম্ভব হলেও দুধের আসল গঠন ও পুষ্টিমান নকল করা সম্ভব নয়।

তাঁর মতে, প্রাথমিক পরীক্ষায় ভেজাল ধরা কঠিন। এ জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন। দুধে পানি, ইউরিয়া, ক্ষার বা ফর্মালডিহাইডের উপস্থিতি নির্ণয়ে আলাদা পরীক্ষা দরকার। মান যাচাইয়ে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাবনায় ভেজাল দুধের কারবার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ভোজ্য তেল, ডিটারজেন্ট ও কস্টিক সোডা মিশিয়ে তৈরি রাসায়নিকযুক্ত দুধ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে শিশু ও রোগীদের ক্ষেত্রে এটি অঙ্গহানি বা কিডনি-লিভারের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কারণ হতে পারে।

জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে দুধে মেশানো রাসায়নিক শনাক্তে আধুনিক ল্যাব প্রয়োজন। পাবনায় এমন ল্যাব নেই। রাজশাহী থেকে ভ্রাম্যমাণ ল্যাব মাসে মাত্র একবার আসে।

তিনি বলেন, জেলায় একটি স্থায়ী ল্যাব স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এটি করা গেলে ভেজাল দুধের কারবার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঢাকা প্রোব এআই সহকারী

প্রস্তুত আছেন
নমস্কার / আসসালামু আলাইকুম! আমি ঢাকা প্রোব এআই সহকারী। আজকের যেকোনো খবর জানতে মুখে বলুন বা লিখুন।