তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন সংকটে পড়েছে দেশের সরু চালের অন্যতম বৃহৎ মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরের চালকলগুলো। বিদ্যুৎ সংকটে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চালের উৎপাদন কমেছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধান, পাশাপাশি উৎপাদিত চালের একটি বড় অংশও খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে মিলাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে সংকট দীর্ঘায়িত হলে চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে কুষ্টিয়ার খাজানগর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ চালকলের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মিলের শ্রমিককে অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন চালকলগুলোতে সংকট তীব্র।
খাজানগরের পাশের বল্লভপুরে অবস্থিত এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চালকল স্বর্ণা অটোরাইস মিলের কর্ণধার আব্দুস সামাদ বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকরা কাজে এসে আবার বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। উৎপাদন না হলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার মিলে প্রতিদিন প্রায় ৯০ টন চাল উৎপাদন হতো। এখন ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করেও ৩০ টনের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে জ্বালানি খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে একই সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
চাল উৎপাদনকারী আরেক প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন রাইস মিলের মালিক জিহাদুজ্জামান জিকু বলেন, উৎপাদনের সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে মেশিনে থাকা ধান নষ্ট হতে শুরু করে। এতে বাই-প্রোডাক্ট বেড়ে যায় এবং চালের উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
তিনি বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির শিল্প ফিডার আলাদা। খাদ্যসংশ্লিষ্ট শিল্প হওয়ায় চালকলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটে চালকলগুলোতে ধান নিয়ে আসা ট্রাকচালকরাও দুর্ভোগে পড়েছেন। নওগাঁ থেকে ধান নিয়ে আসা এক ট্রাকচালক বলেন, ‘আজ নয় দিন ধরে বসে আছি। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন হচ্ছে না, তাই আমাদের ট্রিপও হচ্ছে না। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে এসেছি। আজ দুপুর গড়িয়ে গেলেও এখনো গাড়ি আনলোড করতে পারিনি।’
কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। গত দুই সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে বুধবার সন্ধ্যায় ১৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। এই সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘চালকলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা এরই মধ্যে বৈঠক করেছি। আশা করছি, দ্রুতই একটি সমাধান করা সম্ভব হবে। চালের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাজানগরের চালকলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এতে মিলারদের লোকসানের পাশাপাশি দেশের চালের সরবরাহ ও বাজারদরের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।