রাজধানীতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল। মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়ক-সব স্থানেই এই রিকশার দাপট। প্রচলিত রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গতি অনেক বেশি। তবে ব্রেকিং ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। যার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে নগরবাসীর কাছে এই বাহনটি এখন এক চরম অনিয়ন্ত্রিত আতঙ্কের নাম।
ব্যাটারিচালিত রিকশা গত কয়েক বছরে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় আলোচিত ও বিতর্কিত সংযোজন। এসব বাহন মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে বড় ধরনের উদ্বেগ।
বিআরটিএ ও বিভিন্ন পরিবহন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার চলছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ।
সাধারণ প্যাডেল রিকশার চেসিস ও ব্রেকিং ব্যবস্থা ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতির উপযোগী। পরে এসব রিকশায় ব্যাটারি ও মোটর যুক্ত করে গতি বাড়ানো হয়েছে। এখন কোনো কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলে। অথচ ব্রেকিং ব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সিগন্যাল এড়িয়ে চলা কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে উল্টো পথে গাড়ি চালানোও অটোরিকশচালকদের নিয়মিত অভ্যাস হয়ে উঠেছে। দ্রুতগতিতে অন্য গাড়ির ফাঁক দিয়ে বের হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশি গতির কারণে প্রায়ই রিকশা উল্টে যায়। আবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পথচারীর ওপরও উঠে যাওয়ারও ঘটনা ঘটছে।
রাজধানীর ভাটারা এলাকায় ভাড়াবাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোরশেদ আলম। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, মাসখানেক আগে বাচ্চা নিয়ে নতুন বাজার থেকে সুভাস্তু শপিং মলে যাচ্ছিলাম অটোরিকশায়। ছুটির দিন হওয়ায় রাস্তা অনেকটা ফাঁকা ছিল। চালক অনেকটা দ্রুত গতিতেই চালিয়েছিল। পরে সামনে হঠাৎ আরেকটা রিকশা চলে আসে। কিন্তু আমাদের রিকশার চালক ব্রেক কষলেও গাড়ি থামেনি। গিয়ে সজোরে ধাক্কা লাগে অপর রিকশার সঙ্গে। আমি বাচ্চাসহ পাশে ছিটকে পড়ি। আল্লাহর বিশেষ রহমতে বেঁচে যাই বড় ক্ষতি থেকে। রিকশার জায়গায় বাস হলে তো আমাদের বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতো। ব্যাটারির কারণে রিকশাগুলোর গতি বেড়েছে ঠিকই কিন্তু ব্রেকিং সিস্টেমটা আপডেট করা উচিত। নয়তো মহাসড়কে এগুলো চলাচলের উপযোগী নয়।
রাজধানীর এভারকেয়ার গেটে কথা হয় পথচারী আব্দুল হাকিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, অটোরিকশা দ্রুত যাতায়াতের জন্য খুবই ভালো। কিন্তু চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। বিনা অভিজ্ঞতায় যে কেউ এসেই অটোরিকশা নিয়ে সড়কে উঠে পড়ছেন। আর গতি কন্ট্রোল ব্যবস্থাতো খুবই বাজে। যার কারণে সড়ক দুর্ঘটনাতো প্রায়ই ঘটছে। এসব রিকশার কারণে বেশিই ঘটছে বাইক দুর্ঘটনা।
একটি বেসরকারি গণমাধ্যমের সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন আরিফুল ইসলাম। অফিসে যাতায়াতে তিনি তার ব্যক্তিগত মটোরসাইকেল ব্যবহার করেন। আলাপকালে তিনি বলেন, অটোরিকশাজনিত কারণে সম্প্রতি তিনি বড় ধরনের একটি দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। অফিস শেষে পুরান ঢাকা থেকে বাইক চালিয়ে ভাটারার ছোলমাইদে বাড়ি ফিরছিলেন। বঙ্গবাজার মার্কেট এলাকায় এলে একটি অটোরিকশাকে ওভারটেক করার সময় রিকশাটি তাকে সাইট না দিয়ে পশে চাপিয়ে দেয়। এতে বাইকসহ তিনি পড়ে যান। শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষত হয়। বাইকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, অটোরিকশাগুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে না থাকায় কেউ কোনো নিয়ম মানছে না। সড়কে মাস্তানের মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ ধরলে তাদের মামলাও দিতে পারে না। অনেক সময় চালককে শাসিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া এই অটোরিকশার কারণে অন্যান্য যানবাহন যেমন- বাস, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের গতিও কমে গেছে। সড়কে মোড় ঘুরলেই দেখা মেলে রিকশা, সামনে পেছনে, ডানে বামে সবখানে এর উপস্থিতি। যার কারণে গাড়ির গতি থাকলেও তা ব্যবহার করা যায় না।
কথা হয় পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে গাজীপুর রুটে চলা বিহঙ্গ বাসের এক চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, সড়কে অটোরিকশা তো মাস্তান। গাড়ির গতি বাড়াতে পারি না অটোরিকশার কারণে। সামনে সামনে ওরা চালাচ্ছে। পেছন থেকে কোনো সিগন্যাল ছাড়াই ওভারটেক করছে। ওরা তো রাস্তার আইন কানুন কিছুই জানে না। কোনো হামলা- জেলও হয় না ওদের। খুবই বেপরোয়াভাবে রাস্তায় চলে। সব নিয়ম কানুন খালি আমাদের জন্য। কিছুই হলেই বিশাল অঙ্কের জরিমানা করে। সরকারের উচিত অটোরিকশাগুলোও নিয়মের মধ্যে আনা।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, আমরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছি অটোরিকশা নিয়ে। কোনোভাবেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আইনি কাঠামোর মধ্যে না থাকায় অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কেউ আইন অমান্য করলে তাদের নিয়মিত জরিমানা-ডাম্পিং করা হচ্ছে। অটোরিকশা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি নীতিমালা তৈরি নিয়ে কাজ চলছে। আশা করি, শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের (নিসআ) সাধারণ সম্পাদক ইনজামুল হক বলেন, দেশে অটোরিকশা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানীতে এখন ১০ লাখেরও বেশি অটোরিকশা চলছে। সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে গণঅভ্যুত্থনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আগের তুলনায় প্র্রায় চার গুন বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অটোরিকশাগুলো মহাসড়কে চলার মতো উপযোগী নয়। তবু ঢাকার মূল সড়কগুলোতে ব্যপক অটোরিকশা চলতেছে। যার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।
মহসড়কে অটোরিকশা চলাচলের বিরুদ্ধে আমরা অনেক বছর আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছি। বিশেষ করে ২৪ সালের আগের সরকার এটি নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে অন্তবর্তী সরকারের সময় অটোরিকশা অলিগলি থেকে ঢাকার মূল সড়কে উঠে পড়ে। এরপর থেকে অটোরিকশা ব্যপক বেড়ে গেছে।
লাখ লাখ অটোরিকশা বানানো হচ্ছে— এটিতে ব্যবহৃত ব্যাটারি কোথা থেকে আসে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অটোতে ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। বিশেষ করে সোলার প্যানেলে ব্যবহার করার কথা বলে আমদানি করা হয়। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাত বদল হয়ে রিকশায় ব্যবহার করা হয়।
অটোরিকশা বাড়ার কারণ জানিয়ে নিসআ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন,প্যাডেল চালিত রিকশার থেকে অটোরিকশা চালাতে পরিশ্রম অনেক কম লাগে। অল্প সময়ের মধ্যে আয়ও বেশি হয়। তাই গ্রামে যারা আগে দিনমজুর হিসেবে কৃষি কাজ করতেন, তারা এখন ঢাকায় ছুটে আসেন। বেছে নেয় পেশা হিসেবে অটোরিকশা চালানো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে বর্তমানে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার মধ্যে ৮ থেকে ১০ শতাংশই হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য। বেশিরভাগ রিকশাগুলোরই শুধু প্যাডেল ফেলে মটোর যুক্ত করেছে। ব্রেক আপডেট করা হয়নি। গতি বহুগুন বেড়েছে কিন্তু কন্ট্রোল নেই বলেই চলে। এগুলো সড়ক-মহাসড়কে চলার জন্য মোটেও উপযোগী নয়।
বুয়েটের ডিজাইন করা অটোরিকশার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বুয়েটের দেওয়া ডিজাইনের রিকশাও পুরোপুরি এখন সড়কে চলার উপযোগী নয়। এটি নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।