রবিবার|বাংলা: ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ|ইংরেজি: ১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ|আরবি: ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি; জুলাই ৩৫: রক্তঝরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি; জুলাই ৩৫: রক্তঝরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
সংগৃহীত ছবি
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
৪ আগস্ট ২০২৪ ছিল বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন। অসহযোগ আন্দোলন সেদিন এক বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছায়। দিনের শুরুতে দেশজুড়ে এক ধরনের অস্বাভাবিক শান্ত পরিবেশ থাকলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই তা রূপ নেয় সহিংসতা, রক্তপাত এবং জেলায় জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষে।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ জামায়াত ও তাদের সহযোগী ছাত্রশিবির আত্মগোপন অবস্থায় থেকেও আন্দোলনে সক্রিয় থেকে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যায়। এদিন বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের পদত্যাগের ডাক দিলে সারা দেশে চলমান আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

১৭ বছর ধরে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গুম, খুন, হামলা ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে যে নির্যাতন ভোগ করছিলেন, এ আন্দোলনে তারা ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে দেশ রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়ে মাঠের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। এটি ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। 

প্রতিবাদকারী, পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে দেশব্যাপী সংঘর্ষে অন্তত ৯৩ জন নিহত এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন, যাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। 

সকালে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা রাস্তায় নামার পর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়।

সিরাজগঞ্জে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় হামলা চালিয়ে ১৩ জন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে। পাশের রায়গঞ্জ উপজেলায় আরও পাঁচজন নিহত হন। ফলে সেদিন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সিরাজগঞ্জ জেলায়।

এদিকে রাজধানী ঢাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ফার্মগেট, ধানমন্ডি, মিরপুর-১০, উত্তরা, শাহবাগ ও গুলিস্তানে বিক্ষোভকারী এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফার্মগেটে লাঠি ও সড়কের ব্যারিকেড নিয়ে অগ্রসর হওয়া বিশাল মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা গুলি চালায়। জবাবে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।

ধানমন্ডিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। গুলির শব্দ ও স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়। শাহবাগে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে পিজি হাসপাতাল এলাকায় (বিএসএমএমইউ) এলাকায়, যেখানে অন্তত ২৪টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়।

মিরপুর-১০ এলাকায় বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি হয় সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সমর্থক ও পুলিশ। এলাকাজুড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। পুরান ঢাকায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষের সময় শতাধিক বিক্ষোভকারী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী আদালত চত্বরে প্রবেশ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পুলিশের যানবাহন ভাঙচুর করেন।

রাজধানীর বাইরে লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী, ফেনী, রংপুর, সিলেট, বগুড়া, পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর এবং খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায়ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়।

পুলিশ বিভিন্নস্থানে ব্যারিকেড দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকিয়ে আহত ছাত্রদের হাসপাতালে নিতে বাধা দেয়। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন হাইওয়েতে আহতদের অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে আবারো মারধর করা হয়। যা জনমনে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ক্ষব্ধ জনতাকে আরও উত্তেজিত করে। 

বিক্ষোভকারীদের মারধর ও গুলি করা হয়, সরকারি স্থাপনা ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শুধু চট্টগ্রামেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ১৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষার্থীরা তাদের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট এগিয়ে আনার ঘোষণা দেন। 

এ দিকে বিকেল ৩টায় শাহবাগে সমাবেশে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দল দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। তারা সর্বস্তরের মানুষকে প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং সরকারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

পরে নিহত বিক্ষোভকারীদের লাশ নিয়ে মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

এদিকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারীদের শিক্ষার্থী নয়, বরং ‘অপরাধী’ বলে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অভিভাবকদের সন্তানদের রাজপথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং ‘জঙ্গি হুমকির’ কথা উল্লেখ করা হয়।

একই দিনে হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন লঙ্ঘন বা দাঙ্গার পরিস্থিতিতে প্রথমে রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করবে; কেবল প্রয়োজনে এবং আইনি সীমার মধ্যে সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যথায় সরাসরি প্রাণঘাতী গুলি চালানো অনুমোদিত নয়।

অন্যদিকে রাওয়া ক্লাবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীকে রাজপথ থেকে প্রত্যাহার করে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় শিক্ষক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়। 

এদিন বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবির প্রতি দেশবাসীর সমর্থন রয়েছে।

দিনের শেষে সরকার মোবাইল ফোরজি ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করে, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয় এবং ঢাকা ও দেশের প্রধান প্রশাসনিক এলাকাগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ বহাল রাখে।
নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডারউইন টেস্টে ইতিহাস গড়তে বাংলাদেশের দরকার ৫৭ রান

ডারউইন টেস্টে ইতিহাস গড়তে বাংলাদেশের দরকার ৫৭ রান

ক্রীড়া প্রতিবেদক
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬