রাজধানীর মিরপুরে রোববার গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র যেন এখন নিত্যদিনের -সংগৃহীত ছবি
দেশজুড়ে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর চলমান সরবরাহ সংকটের মধ্যেই আগামী ১০ থেকে ১৫ আগস্ট নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো সরবরাহে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সম্মতি না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাবে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি এখনো সচল না হওয়ায় এলএনজি আমদানির সূচিতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ আগস্টের জন্য নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো সরবরাহে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি।
বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে কেবল সামিট গ্রুপের এফএসআরইউ চালু রয়েছে। এই টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ে নতুন কার্গো না এলে গ্যাস সরবরাহে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা জরুরি ভিত্তিতে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে সৌদি আরামকো ও মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির কাছে এলএনজি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী এলএনজি পাঠাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এদিকে স্পট মার্কেট থেকে ১৫-১৬ আগস্ট সরবরাহের জন্য একটি এলএনজি কার্গো দিতে সর্বনিম্ন দর দিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া লিমিটেড। তবে ১০ থেকে ১৫ আগস্টের জন্য নির্ধারিত দুটি কার্গোর কোনো সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি।
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে। অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে রাজধানীর বাইরে অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক কমপক্ষে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাস দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে।
এদিকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক রাখতে তিতাস গ্যাসকে অতিরিক্ত ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এর ফলে বাখরাবাদ, কর্ণফুলী ও জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ আরও কমেছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি চালু না হলে আগামী দিনগুলোতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হবে। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আরও গভীরভাবে পড়তে পারে।