বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সীমানার মধ্যে যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) জারি করেছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে মহাস্থানগড় সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে ২০১২ সালে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
রোববার (৯ আগস্ট) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আদালতে সরকারের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তাঁকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মণ্ডল ও অ্যাডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম।
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মহাস্থানগড়ে আগত নারীদের নামাজ আদায়ের স্থান ও ওয়াশরুমসহ কিছু প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মহাস্থানগড়ের সীমানার ভেতরে নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজের সুযোগ রেখে হাইকোর্টের রায় সংশোধনের আবেদন জানান তিনি।
অন্যদিকে রিটকারীর পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আদালতে বলেন, মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রাথমিক তালিকায়ও রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার ভেতরে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউনেস্কোর চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের আপিলের অনুমতি দেওয়া হলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মহাস্থানগড়ের ভেতরে যেন কোনো ধরনের নির্মাণকাজ না হয়, সে জন্য স্থিতাবস্থার আদেশ প্রয়োজন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সরকারের আপিল দায়েরের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি মহাস্থানগড় এলাকায় নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা
২০১০ সালে মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে তৎকালীন মাজার কমিটির উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবিতে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মানবাধিকার ও আইন সহায়তাকারী সংগঠন এইচআরপিবি।
রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট একটি কমিটি গঠন করে মহাস্থানগড়ের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা এবং সংরক্ষণের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। পরে ওই কমিটি মহাস্থানগড়ের পূর্ব পাশে, প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার বাইরে একটি মসজিদ নির্মাণের সুপারিশ করে।
শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে যেকোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাটি সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।
১৫ বছর পর ফের নির্মাণকাজের উদ্যোগ
হাইকোর্টের ওই রায়ের পর দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে নতুন করে কোনো বড় ধরনের নির্মাণকাজ হয়নি। তবে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাস্তা নির্মাণের জন্য ৭৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি নজরে আসে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর পর হাইকোর্টের ২০১২ সালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এদিকে মহাস্থানগড় সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষ থেকেও সলিসিটর অফিসে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আপিল বিভাগের আজকের আদেশের ফলে আপিলের বিষয়টি এখন নিয়মিত শুনানির পর্যায়ে যাবে। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা বহাল থাকবে।