রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ৯ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তাঁদের হাজির করা হয়।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি ট্রাইব্যুনালে মামলার অগ্রগতি তুলে ধরেন।
জহিরুল বলেন, এই মামলায় পলাতক ৩০ আসামির মধ্যে ২০ জনকে তাঁদের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি। তাঁদের নন-এক্সিকিউশন রিপোর্ট (এনইআর) আমরা হাতে পেয়েছি। বাকি ১০ জনের এনইআর এখনো পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রক্রিয়াগত জটিলতায় অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি হাসানুল হক ইনু ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে হাজির করা যায়নি।
পরে আদালত বাকি ১০ জনের এনইআরসহ গ্রেপ্তার ১১ আসামিকে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর হাজির করার নির্দেশ দেন।
এর আগে গত ২৭ জুলাই এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। মোট আসামি ৪১ জন। এর মধ্যে এই মামলায় ৯ জনসহ মোট ১১ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়েছে, তৎকালীন সরকার ২০১৩ সালের ৫ মে পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গণহত্যা চালায়। ওইদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের যেকোনো উপায়ে রাতের মধ্যেই শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন।
উপরের নির্দেশ পেয়ে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শাপলা চত্বর ও এর আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ নিজ বাহিনীর নামে অভিযানের নামকরণ করে। পুলিশের অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র্যাব অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবির পক্ষ থেকে ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ নাম দেওয়া হয়। তবে অভিযানটি ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযানের নামকরণের ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, এটি কোনো সাধারণ অভিযান ছিল না।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাত আড়াইটার দিকে সর্বোচ্চ স্কেলে অভিযান শুরু হয়। সমাবেশস্থলে উপস্থিত হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টি ইমপ্যাক্ট গ্রেনেড, রাবার-বল প্রজেক্টাইল ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেন। ফলে ঘটনাস্থলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় হেফাজতের নেতাকর্মীরা জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। হতবিহ্বল হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন আশ্রয় খুঁজে নিজেদের জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া হয়ে শর্টগান ও মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়।
হেফাজত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পথে ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় অনেকে হতাহত হন। রাতের অভিযান এবং দিনব্যাপী হামলা ও আক্রমণে শাপলা চত্বর, মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলামের ৩২ জন নেতাকর্মী শহীদ ও নিখোঁজ হওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মাধানীনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন শহীদ হন।
এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
মোট ৪১ জন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়া অপর আসামিরা হলেন—তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন—দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, এ কে এম শহিদুল হক, শাহরিয়ার কবির, আব্দুল জলিল মণ্ডল, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু।
অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এছাড়া আব্দুর রাজ্জাকও গ্রেপ্তার আছেন। বাকিরা পলাতক।