বরকত বলতে কোনো কিছুর মধ্যে কল্যাণের স্থায়িত্ব, অব্যাহত থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়াকে বোঝায়। ইসলামী দৃষ্টিতে একটি ঘরের প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু অর্থ-সম্পদ, বড় বাড়ি কিংবা দামি আসবাবপত্রে নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্য, ইবাদত ও পারিবারিক শান্তির মধ্যেই নিহিত।
একজন মুমিনের উচিত নিজের ঘর ও পরিবারে বরকত লাভের কারণগুলো অনুসরণ করা। কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা এসেছে, যেগুলো ঘরে কল্যাণ ও বরকত বয়ে আনার মাধ্যম হতে পারে।
১. ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা
ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া এবং খাবার শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ বলা গুরুত্বপূর্ণ আমল। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় ও খাবারের সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তান বলে, এখানে তোমাদের রাত কাটানোর ও খাবারের সুযোগ নেই। আর সে যদি আল্লাহকে স্মরণ না করে, তখন শয়তান সেখানে রাত কাটানো ও খাবারের সুযোগ পাওয়ার কথা বলে। (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৭৬৫)
তাই ঘরের বরকত শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা অর্থসম্পদের ওপর নির্ভর করে না। আল্লাহর জিকির ও আনুগত্যই একটি ঘরের প্রকৃত সৌন্দর্য।
২. পরিবারের মধ্যে সালামের প্রচলন
নিজের ঘরে প্রবেশের সময় পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া ইসলামের সুন্দর একটি শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা পরস্পরের প্রতি সালাম করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা নূর, আয়াত: ৬১)
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সালামের প্রচলন পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বাড়াতে সহায়ক। তাই অন্য কোথাও সালাম দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ঘরেও সালামের চর্চা করা উচিত।
৩. ঘরে কোরআন তিলাওয়াত করা
কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বরকতময় কিতাব। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, এর অর্থ বোঝার চেষ্টা এবং শিক্ষাগুলো জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘরে দ্বিনের পরিবেশ তৈরি করা যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর এটি এমন এক কিতাব, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, বরকতময়।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৯২)
তাই ঘরে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং পরিবারের সদস্যদেরও এতে উৎসাহিত করা উচিত।
৪. ঘরে নফল নামাজ আদায় করা
ফরজ নামাজ মসজিদে আদায় করার পাশাপাশি নফল নামাজের জন্য ঘরকে ইবাদতের স্থান হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা রয়েছে ইসলামে।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে তার নামাজ শেষ করে, তখন সে যেন তার ঘরের জন্যও তার নামাজের একটি অংশ রাখে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার নামাজের কারণে তার ঘরে কল্যাণ সৃষ্টি করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৭৮)
অর্থাৎ ঘরকে শুধু বিশ্রাম ও দৈনন্দিন জীবনের স্থান না বানিয়ে ইবাদতের পরিবেশও তৈরি করা উচিত।
৫. ঘরের জন্য বরকতের দোয়া করা
ঘর ও পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে বরকত প্রার্থনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে নুহ (আ.)-এর একটি দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে—
‘আর বলো, হে আমার রব! আমাকে বরকতময় স্থানে অবতরণ করান; আর আপনিই সর্বোত্তম অবতরণকারী।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ২৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুমিনের উচিত নিজের বাসস্থান, পরিবার ও জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও বরকত প্রার্থনা করা।
একটি বরকতময় ঘর শুধু বড় বাড়ি, দামি আসবাব কিংবা প্রচুর অর্থসম্পদের মাধ্যমে তৈরি হয় না। তাকওয়া, আল্লাহর জিকির, সালাম, কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ, দোয়া এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও শান্তির পরিবেশই একটি ঘরকে প্রকৃত অর্থে বরকতময় করে তুলতে পারে।