রবিবার|বাংলা: ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ|ইংরেজি: ১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ|আরবি: ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে খুলছে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে খুলছে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বৃহত্তম বৈদেশিক আয়ের উৎস। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)–এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পর এটিই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডসহ ১৪টি উৎস দেশ থেকে শ্রমিক নেয় মালয়েশিয়া।

দেশটি নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা, খনিজ, বাগান ও কৃষিসহ প্রায় ১৫টি খাতে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ করে। এই খাত গুলোতে বাংলাদেশের বোয়েসেল এবং প্রায় তিন হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি জনশক্তি রফতানির কাজ করে থাকে।

এই খাতের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ জন কর্মী কাজ করেন। সে হিসাবে এ খাতে সরাসরি কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এ ছাড়া তৃণমূলে কর্মী সংগ্রহে যুক্ত রয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ এজেন্ট। দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় কর্মীদের বেতন, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারও আগের মতো সক্রিয় নয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছি আমরা।

বিশ্বব্যাংক ও আরএমএমআরইউর হিসাব বলছে, দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে দুই থেকে পাঁচ লাখ মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল ও এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে।

যদিও এর আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২২ সালে সিন্ডিকেট পদ্ধতির কারণে মাত্র ১০১ টি রিক্রুটিং এজেন্সি একচেটিয়াভাবে এ খাত নিয়ন্ত্রণ করে- যা সবারই জানা।

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। যা দেশটির মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১৪ শতাংশ।

বিএমইটির তথ্য মতে, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছে- যা বিদেশি শ্রমিকের হিসেবে প্রায় ৩৭ শতাংশ, অর্থাৎ শ্রমিক সংখ্যায় বাংলাদেশ প্রথম। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ৬ লাখ, নেপালের ৪ লাখ, ভারতের ২ লাখ, ফিলিপাইন ২ লাখ, থাইল্যান্ড ২ লাখ, ভিয়েতনাম ১.৫ লাখ ও পাকিস্তানের ১ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ করছে।

২০২৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে বৈধ পথে এসেছে ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। ওই বছর দেশটি বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সের পঞ্চম বৃহত্তম উৎস ছিল।

বিএমইটি-এর তথ্য বলছে,  ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগে অনানুষ্ঠানিকভাবে ২৩ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে এই বাজারে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮০ ও ১৯৮৩ সালেও কিছু কর্মী পাঠানো হয়। তবে ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।

ছয় বছর পর ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগে বাজারটি আবার চালু হয়। কিন্তু শর্তসংক্রান্ত জটিলতায় ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় পুনরায় শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় কর্মী প্রেরণ অনেকটা স্থগিত থাকায় ২০০০ সালে মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগের অনুমতি দিলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

পরে তৎকালীন বিএনপি সরকারের দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর ২০০৬ সালে আবারও কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর দেশে ১/১১ ঘটে এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। অনিয়ম ও অবৈধভাবে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় ধরা পড়ায় ২০০৯ সালে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এ শ্রমবাজার নিষিদ্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার।

এরপর দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে ২০১২ সালে পুরোনো চুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তি হয়। এই চুক্তির পর ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে আবার বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়া যাওয়া শুরু করে। কিন্তু, কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ১০টি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যসহ নানা অভিযোগে ২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো কর্মী প্রেরণের অনুমতি বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার।

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সরকার কর্মী প্রেরণ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। যার ভিত্তিতে ২০২২ সালের আগস্ট মাস থেকে ১০১টি সিন্ডিকেট এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু আবারও সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পঞ্চমবারের মতো ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়া শ্রমবাজার।

সে সময় সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে একজন কর্মীকে চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের কর্মীপ্রতি প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা দিতে হতো। এর সঙ্গে যুক্ত হতো ভিসা ফি, বিমানভাড়া, মেডিকেল পরীক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দাবি, সিন্ডিকেটভুক্ত হতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে।

এরপর থেকে একাধিকবার চেষ্টা করলেও বাজারটি চালু করতে ব্যর্থ হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে শ্রমবাজার খোলার ব্যাপারে ঐ সময় মালয়েশিয়ার সরকারের অনীহাকেও দায়ী করেছেন অনেক অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সাড়া মিলছে না। অন্য দিকে আমাদের সিন্ডিকেট গোষ্ঠী ও এর বিরোধী পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান, উচ্চ সিন্ডিকেট ফি, শ্রমিক হয়রানি, শ্রমিক প্রেরণে উচ্চমূল্য, ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে ফেরত না আসাসহ নানাবিধ কারণে এ শ্রমবাজারের তালা এখনো শক্তভাবে লেগে থাকলেও চাবির সন্ধান মেলেনি আজ পর্যন্ত।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকার এই শ্রমবাজারটি চালু করতে একাধিকবার চেষ্টা চালায়। সাবেক প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফর শেষে ঘটা করে বলেছিলেন, 'কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে মালয়েশিয়া।'
কিন্তু সে আশ্বাস অশ্ব ডিম হিসেবেই থেকেছে তাদের কর্মকাল পর্যন্ত।

বৈঠক থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও দুই দেশের বৈঠক হওয়ার ৫ মাস পরে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ১০টি শর্ত জুড়ে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। যার থেকে তিনটি শর্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে গত বছরের ৪ নভেম্বর মালয়েশিয়া সরকারকে চিঠি দেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে সেই চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি দেশটির সরকার। শুধু চিঠির উত্তর নয়, মালয়েশিয়ার শর্ত পূরণ করা রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা বাংলাদেশ পাঠালেও এ বিষয়েও আর কিছু জানায়নি দেশটির সরকার।

বিএমইটি সূত্র থেকে জানা যায়, গত বছরের ৩১ মে থেকে বাংলাদেশসহ ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু গত জানুয়ারি মাস থেকে ইন্দোনেশিয়া, নেপালসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিতে থাকে মালয়েশিয়া। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে ইতোমধ্যে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে দেশটি। এই দুটি দেশ থেকে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। 

কিন্তু সেই তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক গেছে মাত্র ২৯০ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নেপাল ২১ হাজার ১৮৩ জন ও ইন্দোনেশিয়া ২৯ হাজার ৯০০ শ্রমিক পাঠিয়েছে। গত নভেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়া ২ হাজার ৫৬১ জন ও নেপাল ৫ হাজার ৭৭৩ জন শ্রমিক পাঠিয়েছে। তার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে গেছে খুবই কম শ্রমিক।  

এছাড়াও বাংলাদেশ বাদে অপর ১৪ সোর্স কান্ট্রিগুলো ২০২৫ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২২ জন শ্রমিক পাঠাতে নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে নেপাল ৬০ হাজার, ইন্দোনেশিয়া ২২ হাজার ৬৮৫, ভারত ১২ হাজার ২৭ জন, পাকিস্তান ৭ হাজার ৪২৮ জন, ফিলিপাইন ৬ হাজার ২০৪ জন, মিয়ানমার ১ হাজার ৩৬০ জন, থাইল্যান্ড ৬০৮ জন, শ্রীলঙ্কা ৩৭৭ জন ও ভিয়েতনাম ৯২ জন। আর বাংলাদেশ থেকে এ সময় নিবন্ধন হয়েছে ১ হাজার ৮৫৩ জন।

কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচবার বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে এই বাজারটি পুনরায় চালু করা বর্তমান সরকারের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং একটি বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করে চালুর বিষয়ে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।

সর্বশেষ গত ২১-২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তাতে আশার আলো দেখছেন এ খাত সংশ্লিষ্টজন এবং অভিবাসন প্রত্যাশীরা। তারেক রহমানের এই সফর ঘিরে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও উন্মুক্ত হওয়ার আশা করছে আপামর জনগণও। কেননা, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে ব্যাহত হয়েছে আমাদের শ্রমবাজার।

লেখক: উপপরিচালক (প্রশাসন) ও সিনিয়র সহকারী সচিব, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
মসজিদের ভেতরে মুসল্লিকে হাঁসুয়া দিয়ে কুপিয়ে জখম

মসজিদের ভেতরে মুসল্লিকে হাঁসুয়া দিয়ে কুপিয়ে জখম

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

ঢাকা প্রোব ডেস্ক
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬