জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও জীবনধারা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। সরকার ও বিশিষ্টজন এই আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছেন, যার অধিকাংশই ইতিবাচক। পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসরদের বহুমুখী অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
পাঁচ যুগ আগে ঘটেছিল অনুরূপ আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। সেদিন পতন হয়েছিল আরেকটি অত্যাচারী স্বৈরাচারী সরকার, যা মাত্র সাড়ে ৩ বছরে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটিকে স্বেচ্ছাচারী ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে অধঃপতনের সীমায় ঠেলে দিয়েছিল। যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য দেশবাসী আজীবন সংগ্রাম করেছেন, আত্মাহুতি দিয়েছেন, তা ছুড়ে ফেলে তাদের সব মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। তৎকালীন দলীয় মোড়ল ও চাটুকারবেষ্টিত প্রশাসন হয়ে ওঠে একটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাসী ও কালোবাজারের আখড়া। রাজনীতির ধারা ছিল সরকারবিরোধী দেশপ্রেমিকদের দমন, পীড়ন আর নিধন।
পঁচাত্তরের আগস্ট-বিপ্লব একটি নিছক সামরিক অভ্যুত্থান নয়; তা ছিল অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটাকে রক্ষায় একগুচ্ছ সৈনিকের মরণপণ অভিযান। এর ব্যাপ্তি ও ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
দুঃখজনক যে, সেই অভিযানে শেখ মুজিবুর রহমানসহ উভয় পক্ষের প্রায় ডজন দু-এক লোক নিহত হন। তৃতীয় মাত্রায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিশনের একজন নেতা, কর্নেল খন্দকার আব্দুর রাশিদ বলেছেন, ঘটনাস্থলে মুজিব বা অন্য কারো মৃত্যু তাদের কাম্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল মুজিবকে বন্দি করে এনে সংক্ষিপ্ত বিচারের সম্মুখীন করা। তিনি এটিও স্বীকার করেন, সেই পরিস্থিতিতে মুজিবকে জীবিত রেখে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা অসম্ভব ছিল, তাই সম্ভবত তাকে যেতেই হতো। কী পরিস্থিতিতে মুজিব ও অন্যরা সেদিন মারা পড়েন, তা কর্নেল এমএ হামিদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেজর বজলুল হুদা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, দুপক্ষের গোলাগুলিতে শেখ মুজিবসহ কিছু সৈন্য মারা যান। ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান এবং না বলা কিছু কথা’ শিখা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৫-২৮)
১৫ আগস্টকে বুঝতে হলে, জানতে হলে আমাদের পঁচাত্তরের বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে, তখনকার পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হবে। অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ১৫ আগস্ট ছিল অনিবার্য, শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যাচারী জাঁতাকলে চাপা দেশবাসীর আকুল আবেদন। মুজিব নিজেই ডেকে এনেছিলেন তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে যে পরিমাণ উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং আন্তরিক ভালোবাসা দিয়েছিল, পৃথিবীতে খুব কম নেতার ভাগ্যে তা জুটে। কিন্তু তখনো মানুষ জানত যে, স্বাধীনতার ঘোষণার ব্যাপারে শেখ মুজিবুর রহমানের তীব্র আপত্তি ছিল। তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায় নিতে চাননি। তিনি দেশবাসীকে একপ্রকার অসহায় রেখে পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে গোপন সমঝোতার অনেক অভিযোগ রয়েছে।
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক খুশওয়ান্ত সিং ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় শেখ মুজিব সম্পর্কে লিখেছিলেন, “১৯৭০ সালে তিনি ছিলেন তার দেশের মানুষের চোখের মণি। কয়েক বছরের মধ্যে তার সে মর্যাদা ম্লান হয়ে যায় এবং তিনি আত্ম-অহমিকার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। এটি ছিল একধরনের folie de grandeur-এর বাস্তব উদাহরণ। তিনি কখনো ধারণা করতে পারেননি যে যারা তাকে সামনে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে, তারাই পেছনে তাকে ‘বঙ্গশত্রু’ বলে গালাগাল দেয়।”
১৯৭৩ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে এক জনসভায় ডাকসু সহসভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়া ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রত্যাহার করেন এবং দাবি করেন, সব অফিস-আদালত থেকে মুজিবের ছবি সরিয়ে ফেলা হোক। সেই সভায় নানা স্লোগানের মধ্যে সবচেয়ে প্রবল ছিল, ‘বাংলার মীরজাফর : শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের অগ্নিকন্যা ও পরে জাতীয় আওয়ামী পার্টির (মুজাফফর) নেতা মতিয়া চৌধুরী এবং পরে হাসিনার আওয়ামী মন্ত্রী, ঘোষণা করেন, ‘মুজিবের পিঠের চামড়া দিয়ে জুতো এবং ডুগডুগি বানানো হবে।’ শাহরিয়ার কবির, পরে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, ঘোষণা করেন, ‘মুজিব, তুমি আর বঙ্গবন্ধু নও, তুমি জাতির বিশ্বাসঘাতক।’ (দৈনিক সংবাদ, ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩)
নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান এবং ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম শেখ মুজিবের প্রশাসনের দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছে, যার শাসনামলে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। শহরের ডাস্টবিনে এক টুকরো উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য মানুষ এবং পশুর সংগ্রাম ছিল একটি সাধারণ দৃশ্য। দরিদ্র নারীরা শরীর ঢাকার মতো কাপড় না থাকায় বাইরে বের হতে পারত না। মৃতদেহ কবর দিতে হয় কলাপাতায় মুড়িয়ে। অথচ ত্রাণসামগ্রীর অভাব ছিল না। এগুলো কোনো কল্পকাহিনি নয়; তখনকার বাস্তব জীবনের করুণ চিত্র! ওই সময়ের পত্রিকার পাতাগুলোয় খুঁজলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে।
যখন রাস্তাঘাটে এবং গ্রামাঞ্চলে অনাহারে কঙ্কালসার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল, তখন বিপরীত চিত্র দেখা গেল গণভবনে। জুলাই ১৯৭৫-এ, শেখ মুজিবের দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামালের রাজকীয় আড়ম্বরে বিয়ের অনুষ্ঠান তার সরকারি বাসভবনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ‘ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড-বিজেতা’ জগলুল হোসেন লেখেন, ‘মুজিব সরকার ৩০ হাজার দেশপ্রেমিক হত্যা করে। তাদের অপশাসনে দেশে নেমে আসে নির্বিচার হত্যা, নিপীড়ন, নির্যাতন, লুণ্ঠন, দখলবাজি, সীমান্ত পাচার ইত্যাদির বিভীষিকা।
১৯৭৪ সালের শেষদিকে দেশে জরুরি ব্যবস্থা আইন এনে স্থগিত করা হয় সব মৌলিক অধিকার; চারটি সরকারনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র ছাড়া বাকিগুলোর প্রকাশনা বন্ধ; রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। যারাই সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যেত, তাদের স্থান হয় জেলে, নয়তো তাদের আর কখনো দেখা যায়নি।
এতেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে মুজিব ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি বিতর্কহীন, এগারো মিনিটের সাংবিধানিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেকে রাষ্ট্রপতি বানালেন। সঙ্গে নিজেকে ঘোষণা করলেন ‘জাতির পিতা’, যে জাতিকে তিনি কখনো চাননি।
২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫-এ নিউ ইয়র্ক টাইমস এ ঘটনাকে ‘বাংলাদেশে নবজাত গণতন্ত্রের জন্য মৃত্যুঘণ্টা’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তদুপরি, আওয়ামী ছাত্রলীগের মাধ্যমে মুজিবকে আজীবন রাষ্ট্রপতি করার পাঁয়তারা হচ্ছিল।
মুজিবের তথাকথিত ম্যাগনাম ওপাস (Magnum Opus), বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো। বাকশাল ছিল সমাজতান্ত্রিক আদলে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। দেশকে ৬১টি রাজনৈতিক জেলায় ভাগ করে প্রতিটি জেলার জন্য একজন বাকশাল গভর্নর ও একজন বাকশাল সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সরাসরি শেখ মুজিব বাছাই করেন। এই ব্যবস্থা ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
ইতিহাসবিদ ও লেখক কে আলি মুজিব সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে একজন স্বৈরাচারী শাসক, যিনি জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসনের অধীনে সম্পূর্ণ একনায়কত্ব কায়েম করেছিলেন।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল লন্ডনে অবস্থানকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘ফেরাউনের পতন হয়েছে। স্বৈরাচারের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে।’
শেখ মুজিবুর রহমান নিহতের দিনই তার মন্ত্রিসভার সদস্য কেন্দ্রীয় বাকশাল নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। তিনি মুজিবের মন্ত্রিসভার অনেককে নিয়েই সেই সরকার গঠন করেন। ১৫ আগস্ট সকালের বেতার ভাষণে তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজন’ বলে উল্লেখ করেন। পরে ৩ অক্টোবর অন্য এক রেডিও ভাষণে তিনি শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের ‘জাতির সূর্য সন্তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
লেখক : প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা, কূটনীতিক