চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে দেশের প্রথম বিদেশি বিনিয়োগের কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ডেনমার্কের মায়ের্স্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এ প্রকল্পে ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর এলাকায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে। প্রকল্পের জন্য ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় গত ২২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে জমি বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালু হওয়ার কথা।
চালু হওয়ার পর ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।
চুক্তির সময় প্রকল্পটিতে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছিল। এখন সেই বিনিয়োগ বেড়ে ৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থে টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।
প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ টার্মিনালে সাতটি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে। এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশ বিদ্যুতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিবিএফওটি (ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর) ভিত্তিতে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মোট জমির ৩২ একর এলাকায় মূল টার্মিনাল থাকবে। ৭ দশমিক ১৫ একরে হবে কনটেইনার ইয়ার্ড। আর প্রায় ১০ একর এলাকায় থাকবে ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা।
টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ৮ লাখ টিইইউএস। হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের সক্ষমতা আরও প্রায় ৯ লাখ টিইইউএস বাড়বে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ৪৪ লাখ টিইইউএস।
বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগও থাকবে নতুন এই টার্মিনালে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের এবং ২ হাজার ৮০০ টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়।
এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। ৬১৩ মিটার জেটিতে একসঙ্গে তিনটি তুলনামূলক ছোট অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
এই টার্মিনাল নির্মাণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সরাসরি কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ৮ লাখ কনটেইনারের প্রতিটির জন্য ২১ ডলার পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাবে ২৩ ডলার।
এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ২৫০ কোটি টাকা ফি পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়ত হামিম বলেন, এটি চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও চারটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। নতুন এই টার্মিনাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে নতুন একটি মাইলফলক তৈরি হবে।
এর আগে রোববার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে বড় মাইলফলক। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।