প্রলয়ংকরী যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত ইরান.
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘প্রকৃত কূটনীতি’র জন্য তেহরান এখনও প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে যেকোনো নতুন মার্কিন হামলা মোকাবিলার জন্যও ইরান প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি প্রলয়ংকরী যুদ্ধের দিকে গেলেও ইরান পিছু হটবে না বলে সতর্ক করেছেন তিনি।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর আরাগচির এই বক্তব্যে একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখার অবস্থানই উঠে এসেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনা হতে পারে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ যুদ্ধে জয়ী হবে।সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটি, যেটি ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে, সেটিকে লক্ষ্য করে কথিত নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ‘দৃঢ়ভাবে’ প্রত্যাখ্যান করেছে লন্ডনে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস।ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও তিনি নিউইয়র্কে যুদ্ধের প্রস্তাব নিয়ে যাননি; তারা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গিয়েছিলেন। তবে তিনি বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের মুখে ইরান দৃঢ় থাকবে— ‘এমনকি তা প্রলয়ংকরী যুদ্ধেও গড়ালেও’। একই সঙ্গে ইরান ‘প্রকৃত কূটনীতি’র জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।এর আগে এনবিসি নিউজকে আরাগচি বলেছিলেন, ট্রাম্প তেহরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তা মোকাবিলার জন্য ইরান ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’।ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও সামরিক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, ইরানের যোদ্ধাদের আঘাতের পর দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় জলসীমা থেকে ‘শত্রু’ আরব সাগরের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভবিষ্যতে আরব সাগর থেকেও তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন।ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মরণ এবং ২০২৪ সালে ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় খামেনি বলেন, হরমুজ প্রণালির রক্ষাকারী ও ইরানের সামরিক বাহিনীর হাতে শত্রুপক্ষ ‘বেদনাদায়ক আঘাত’ পেয়েছে।হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ অ্যাডমিরাল হাবিবোল্লাহ সাইয়ারি বলেছেন, শত্রুপক্ষের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা হলো— হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তিনি বলেন, ওমান সাগরের উত্তরাংশ ও হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে ইরানের নৌবাহিনী এবং পশ্চিমাংশ, প্রণালি ও পারস্য উপসাগর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো পক্ষকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়ার বিনিময়ে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।এর পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, হরমুজের ওপর ইরানের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ থাকার দাবি সত্য নয়। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। তাদের বক্তব্য, এটিই প্রমাণ করে যে ইরান কৌশলগত এই নৌপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সেন্টকম আরও দাবি করেছে, ‘ইরানের কোনো নৌবাহিনী নেই’, কারণ মার্কিন বাহিনী সেটি ডুবিয়ে দিয়েছে।ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ের শর্তের কথা জানিয়েছে।জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসি নিউজকে বলেন, ইরানের প্রস্তাবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দ অর্থে প্রবেশাধিকার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি ছিল। ওয়াল্টজের ভাষ্য, এসব নিষেধাজ্ঞা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এগুলো ‘বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা’। তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাতটি প্রস্তাবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি না চালানোর কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) ইরানের বিরুদ্ধে ‘লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি পাঠিয়েছে বলে দাবি করেন ওয়াল্টজ। তার অভিযোগ, তেহরান পরমাণু পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের যথাযথ নজরদারির সুযোগ দেয়নি।ইরানের হরমুজ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, ওয়াশিংটন ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে এবং মনে করছে সময় গড়ানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।ওয়াশিংটন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক আবাস আসলানি।সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এই জ্যেষ্ঠ গবেষকের ভাষ্য, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তার মতে, উচ্চঝুঁকির কূটনীতিতে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ট্রাম্প অল্প সময়ের ব্যবধানে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রিচার্ড স্মায়ারার মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পকে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প হয়তো নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত বিষয়টি টেনে নিতে চান। তবে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং দেশটিতে গ্যাস ও ডিজেলের দামও বেড়েছে। তার মতে, যুদ্ধ শেষ হলে তা ট্রাম্পের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু কী শর্তে যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইরানকে কী ধরনের ছাড় দেওয়া হবে— সেটিই রাজনৈতিকভাবে জটিল বিষয়।এদিকে ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেররিজম পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং তাদের বয়স ২০-এর কোঠায়।ঘাঁটিটি রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) ফেয়ারফোল্ড ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হামলার কথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র থাকার বিষয়ে ব্রিটিশ কিছু ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা শুরু হওয়ার পর লন্ডনে ইরানি দূতাবাস তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।এক বিবৃতিতে দূতাবাস বলেছে, ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার ‘জল্পনা-কল্পনা দৃঢ়ভাবে ও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান এবং নিন্দা’ করছে তারা।যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের মধ্যে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দরও রেকর্ড পর্যায়ে নেমেছে। ইরানের মুক্ত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট পাসিজির হিসাবে, ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিক্রয়মূল্য ২৩ লাখ রিয়ালে পৌঁছেছে, যা দেশটির মুদ্রার ইতিহাসে সর্বনিম্ন।যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিকভাবে তেহরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপের মধ্যেই রিয়ালের এই দরপতন হয়েছে। ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের দাম এক বছরে বেড়েছে ১২৮ দশমিক ১ শতাংশ।যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অচলাবস্থার মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে সমঝোতায় না পৌঁছানোর পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৯৩ ডলারে ওঠে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু ও পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তেলের দাম বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘প্রকৃত কূটনীতি’র জন্য তেহরান এখনও প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে যেকোনো নতুন মার্কিন হামলা মোকাবিলার জন্যও ইরান প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি প্রলয়ংকরী যুদ্ধের দিকে গেলেও ইরান পিছু হটবে না বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর আরাগচির এই বক্তব্যে একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখার অবস্থানই উঠে এসেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনা হতে পারে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ যুদ্ধে জয়ী হবে।
সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটি, যেটি ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে, সেটিকে লক্ষ্য করে কথিত নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ‘দৃঢ়ভাবে’ প্রত্যাখ্যান করেছে লন্ডনে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও তিনি নিউইয়র্কে যুদ্ধের প্রস্তাব নিয়ে যাননি; তারা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গিয়েছিলেন। তবে তিনি বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের মুখে ইরান দৃঢ় থাকবে— ‘এমনকি তা প্রলয়ংকরী যুদ্ধেও গড়ালেও’। একই সঙ্গে ইরান ‘প্রকৃত কূটনীতি’র জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে এনবিসি নিউজকে আরাগচি বলেছিলেন, ট্রাম্প তেহরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তা মোকাবিলার জন্য ইরান ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও সামরিক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, ইরানের যোদ্ধাদের আঘাতের পর দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় জলসীমা থেকে ‘শত্রু’ আরব সাগরের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভবিষ্যতে আরব সাগর থেকেও তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মরণ এবং ২০২৪ সালে ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় খামেনি বলেন, হরমুজ প্রণালির রক্ষাকারী ও ইরানের সামরিক বাহিনীর হাতে শত্রুপক্ষ ‘বেদনাদায়ক আঘাত’ পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ অ্যাডমিরাল হাবিবোল্লাহ সাইয়ারি বলেছেন, শত্রুপক্ষের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা হলো— হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তিনি বলেন, ওমান সাগরের উত্তরাংশ ও হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে ইরানের নৌবাহিনী এবং পশ্চিমাংশ, প্রণালি ও পারস্য উপসাগর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো পক্ষকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়ার বিনিময়ে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, হরমুজের ওপর ইরানের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ থাকার দাবি সত্য নয়। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। তাদের বক্তব্য, এটিই প্রমাণ করে যে ইরান কৌশলগত এই নৌপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সেন্টকম আরও দাবি করেছে, ‘ইরানের কোনো নৌবাহিনী নেই’, কারণ মার্কিন বাহিনী সেটি ডুবিয়ে দিয়েছে।
ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ের শর্তের কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসি নিউজকে বলেন, ইরানের প্রস্তাবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দ অর্থে প্রবেশাধিকার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি ছিল। ওয়াল্টজের ভাষ্য, এসব নিষেধাজ্ঞা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এগুলো ‘বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা’। তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাতটি প্রস্তাবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি না চালানোর কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) ইরানের বিরুদ্ধে ‘লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি পাঠিয়েছে বলে দাবি করেন ওয়াল্টজ। তার অভিযোগ, তেহরান পরমাণু পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের যথাযথ নজরদারির সুযোগ দেয়নি।
ইরানের হরমুজ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, ওয়াশিংটন ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে এবং মনে করছে সময় গড়ানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
ওয়াশিংটন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক আবাস আসলানি।
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এই জ্যেষ্ঠ গবেষকের ভাষ্য, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তার মতে, উচ্চঝুঁকির কূটনীতিতে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ট্রাম্প অল্প সময়ের ব্যবধানে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রিচার্ড স্মায়ারার মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পকে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প হয়তো নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত বিষয়টি টেনে নিতে চান। তবে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং দেশটিতে গ্যাস ও ডিজেলের দামও বেড়েছে। তার মতে, যুদ্ধ শেষ হলে তা ট্রাম্পের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু কী শর্তে যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইরানকে কী ধরনের ছাড় দেওয়া হবে— সেটিই রাজনৈতিকভাবে জটিল বিষয়।
এদিকে ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেররিজম পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং তাদের বয়স ২০-এর কোঠায়।
ঘাঁটিটি রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) ফেয়ারফোল্ড ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হামলার কথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র থাকার বিষয়ে ব্রিটিশ কিছু ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা শুরু হওয়ার পর লন্ডনে ইরানি দূতাবাস তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এক বিবৃতিতে দূতাবাস বলেছে, ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার ‘জল্পনা-কল্পনা দৃঢ়ভাবে ও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান এবং নিন্দা’ করছে তারা।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের মধ্যে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দরও রেকর্ড পর্যায়ে নেমেছে। ইরানের মুক্ত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট পাসিজির হিসাবে, ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিক্রয়মূল্য ২৩ লাখ রিয়ালে পৌঁছেছে, যা দেশটির মুদ্রার ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিকভাবে তেহরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপের মধ্যেই রিয়ালের এই দরপতন হয়েছে। ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের দাম এক বছরে বেড়েছে ১২৮ দশমিক ১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অচলাবস্থার মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে সমঝোতায় না পৌঁছানোর পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৯৩ ডলারে ওঠে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু ও পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তেলের দাম বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।