বিশ্বকাপ জয়ের পর সতীর্থদের সঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে উদযাপন করছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। ছবি: রয়টার্স
নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক ফাইনালের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের চরম উত্তেজনাকর লড়াইয়ে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে স্পেন। ২০১০ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এটি স্প্যানিশদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। পুরো টুর্নামেন্টে অজেয় থাকা স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের সামনে শেষ পর্যন্ত ভাঙল আলবিসেলেস্তেদের টানা দ্বিতীয়বার কাপ নেওয়ার স্বপ্ন।
খেলার শুরু থেকেই বল পজেশন ও নিখুঁত পাসিংয়ে আধিপত্য বিস্তার করে স্পেন। প্রথমার্ধের মাত্র ৫ মিনিটেই লামিন ইয়ামাল ও দানি ওলমোর যুগলবন্দীতে প্রথম আক্রমণ শানায় তারা। তবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের একের পর এক চোখধাঁধানো সেভের কারণে গোলের দেখা পায়নি কোনো দলই।
ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অবশেষে আসে সেই ১০৬তম মিনিট (অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় অর্ধে)। উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসের দারুণ এক ক্রসে শূন্যে ভেসে আসা বলকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনার জালে জড়ান বদলি হিসেবে নামা ফরোয়ার্ড ফেররান তরেস। এই এক গোলের লিডই স্পেনকে এনে দেয় বিশ্বজয়ের মুকুট।
ফাইনালে দুই দলের মাঠের লড়াইয়ের পরিসংখ্যান স্পেনের একচেটিয়া আধিপত্যের কথা বলছে, যেখানে পুরো ম্যাচজুড়েই স্প্যানিশদের দাপট ছিল স্পষ্ট। বল দখলের লড়াইয়ে ৬৮ শতাংশ সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্পেনের ফুটবলাররা মাঠ শাসন করেছেন, বিপরীতে আর্জেন্টিনার দখলে ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ বল। আক্রমণভাগের দিক থেকেও আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি করেছে দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা; পুরো ম্যাচে তারা আর্জেন্টিনার গোলমুখে ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টিই ছিল অন-টার্গেট বা লক্ষ্যের ভেতরে।
অন্যদিকে, স্পেনের নিশ্ছিদ্র রক্ষণভাগের কারণে আর্জেন্টিনা ১২০ মিনিটের খেলায় গোলমুখে মাত্র ৩টি শট নিতে পারলেও তার একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। পাসিংয়ের ক্ষেত্রেও স্পেন দেখিয়েছে জাদুকরী নিখুঁততা; ৮০৩টি পাসের মধ্যে তাদের সফলতার হার ছিল ৯০ শতাংশ, যেখানে আর্জেন্টিনা ৪৪৫টি পাসের মধ্যে কেবল ৭৮ শতাংশ নির্ভুল করতে পেরেছে। এছাড়া স্পেন ৯টি কর্নার আদায় করে ম্যাচের ওপর চাপ বজায় রাখে, যেখানে আর্জেন্টিনা পায় মাত্র ৪টি কর্নার। মাঠের শৃঙ্খলা ও আগ্রাসনের দিক থেকেও চরম চাপে ছিল আলবিসেলেস্তেরা; যেখানে স্পেন কোনো কার্ড না খেয়ে ম্যাচ শেষ করেছে, সেখানে আর্জেন্টিনা ২৪টি ফাউল করে ৫টি হলুদ কার্ডের পাশাপাশি এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডের বড় ধাক্কা খেয়েছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের মাস্টারক্লাস রণকৌশলের কাছেই মূলত মার খেয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফাইনালজুড়ে আলবিসেলেস্তেদের কার্যত বোতলবন্দি করে রাখতে স্প্যানিশ কোচ অত্যন্ত চতুর এবং আগ্রাসী পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। স্পেনের জয়ের প্রধান কৌশলই ছিল মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ; রদ্রি ও পেড্রির চমৎকার কম্বিনেশনে তারা শুরু থেকেই বল পজেশন নিজেদের হোল্ডে রাখে এবং আর্জেন্টিনাকে নিচ থেকে কোনো আক্রমণ বা বিল্ড-আপ গড়ার সুযোগই দেয়নি।
লিওনেল মেসিকে নিষ্ক্রিয় করতে স্পেন বিশেষ ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করেছিল, যেখানে মার্ক কুকুরেয়া এবং পাউ কুবার্সিরা মেসি বল পাওয়া মাত্রই কড়া মার্কিংয়ে তাকে ঘিরে ধরেন— যার ফলে পুরো ১২০ মিনিটে আর্জেন্টিনা স্পেনের ডিবক্সে কোনো ভীতি ছড়াতে পারেনি। এর পাশাপাশি স্পেনের অন্যতম সেরা চাল ছিল তাদের গেম চেঞ্জারদের ব্যবহার; ম্যাচের ৬১ মিনিটে প্রধান স্ট্রাইকার ওয়ারজাবালকে তুলে উইঙ্গে গতি বাড়াতে ফেররান তোরেসকে মাঠে নামানোই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট, যিনি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সুযোগসন্ধানী গোলটি করে স্পেনের বিশ্বজয় নিশ্চিত করেন।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার এই হৃদয়বিদারক হারের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ উঠে এসেছে, যার মধ্যে মাঠের শৃঙ্খলা হারানো ও দুর্ভাগ্য অন্যতম। ম্যাচের ৯০ মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়, যা অতিরিক্ত সময়ের চরম মুহূর্তে তাদের শক্তি ও মনোযোগ দুটিই কমিয়ে দেয়। এর আগে প্রথমার্ধের ৪৩ মিনিটেই দলের প্রধান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তাছাড়া স্কালোনির শিষ্যদের আক্রমণভাগের চরম ব্যর্থতা এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় দায় হিসেবে দেখা গেছে; হুলিয়ান আলভারেজ ও নিকোলাস গঞ্জালেসরা স্পেনের ডিবক্সে কোনো কার্যকর আক্রমণ শানাতে পারেননি এবং ম্যাচের ১১৬ মিনিটের আগে তারা কোনো কাউন্টার অ্যাটাকেও উঠতে পারেননি। ১০ জনের দল নিয়ে অতিরিক্ত সময়ের ক্লান্তিকর লড়াই এবং স্পেনের হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের প্রতিরোধ।
ম্যাচ শেষে জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্বজয়ী ও টুর্নামেন্টের সেরা পারফর্মারদের হাতে ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। রানার্সআপ হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত অর্জনে আলো ছড়িয়েছেন আলবিসেলেস্তেরা, যেখানে টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলে সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কারটি নিজের করে নিয়েছেন স্পেনের মাঝমাঠের জেনারেল রদ্রি।
ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে গোলবঞ্চিত রাখা স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন জিতে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’। অন্যদিকে, স্পেনের রক্ষণভাগের উদীয়মান তারকা পাউ কুবার্সি নির্বাচিত হয়েছেন বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান বা তরুণ খেলোয়াড়।
পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের জালে সর্বোচ্চ ১০টি গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নিয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। দলীয় অর্জনের দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন স্পেন ট্রফির পাশাপাশি রেকর্ড ৫ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬১০ কোটি টাকা) প্রাইজমানি ঘরে তুলেছে, আর রানার্সআপ আর্জেন্টিনা পেয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪০৩ কোটি টাকা)।