অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অতিরিক্ত ফাউল করার মূল কারণ ছিল স্পেন দলের পাসিং ও বল পজেশনের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য নষ্ট করার একটি কৌশলগত প্রয়াস। এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা মোট ২৪টি ফাউল করে, যা টুর্নামেন্টের যেকোনো ম্যাচের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পুরো ম্যাচে স্পেন প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের মতো মিডফিল্ডারদের পাসিং ছন্দ নষ্ট করতে এবং আক্রমণ রুখতে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা একের পর এক কৌশলগত ফাউল করতে বাধ্য হন। স্পেনের দুই উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি ও ড্রিবলিং সামলাতেও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের হিমশিম খেতে হয়; বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে তাদের কাউন্টার-অ্যাটাক রুখতে ট্যাকল করতে গিয়ে ফাউলের সংখ্যা বাড়ে।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই আর্জেন্টিনার দুই মূল সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন। নতুন ও অনভিজ্ঞ রক্ষণভাগ নিয়ে স্পেনের আক্রমণভাগের গতি সামলাতে গিয়ে ডিফেন্ডাররা বারবার টাইমিং মিস করে ফাউল করে বসেন। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করছিল। ম্যাচের ৯০+৩ মিনিটে দলের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি এনসো ফের্নান্দেস মেজাজ হারিয়ে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
দুই ফাইনাল, দুই আর্জেন্টিনা
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনাল আর ২০২৬ নিউ জার্সি ফাইনালে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের মধ্যে ছিল রাত-দিনের ব্যবধান। কাতারে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবল খেলেছিল; ২০২৬-এর ফাইনালে তারা সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক ও অতি-আগ্রাসী রূপ ধারণ করে।
২০২২ সালে ডি মারিয়া ও মেসির যুগলবন্দিতে আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল এবং পুরো ম্যাচজুড়ে ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে তটস্থ রেখেছিল। অথচ ২০২৬-এর ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলপোস্টে একটি শটও নিতে পারেনি, উল্টো স্পেন তাদের ওপর ২০টি শট নিয়ে চেপে বসেছিল।
কাতারে এনসো ফের্নান্দেস, ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো দে পলের মাঝমাঠ ফ্রান্সের গ্রিজম্যান-চুয়ামেনিকে বোতলবন্দি করে মেসিকে খেলার জায়গা করে দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর ফাইনালে স্পেনের রদ্রি ও পেদ্রির কৌশলের সামনে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে, ফলে বল না পেয়ে লিওনেল মেসি পুরো ম্যাচে প্রায় অদৃশ্য হয়ে ছিলেন।
কাতার ফাইনালে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি হজম করলেও অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারে স্নায়ু ধরে রেখেছিল। কিন্তু ২০২৬ ফাইনালে স্পেনের গতির সঙ্গে না পেরে উঠে তারা একের পর এক ফাউল করতে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি এনসো ফের্নান্দেসের লাল কার্ড।
২০২২ ফাইনালে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে টাইব্রেকার ছাড়া তেমন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু ২০২৬ ফাইনালে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ায় তাকে ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেভ করতে হয়। মূলত তার কারণেই আর্জেন্টিনা ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিতে পেরেছিল। এত আক্রমণ প্রতিহত করার পরও অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় স্পেনের ফেরান তোরেস আর্জেন্টিনার ক্লান্ত রক্ষণভাগের সামান্যতম ভুলকে কাজে লাগিয়ে ম্যাচের একমাত্র ও জয়সূচক গোলটি করেন।
পতনের কারণ
আর্জেন্টিনার এই পারফরম্যান্সের পতনের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না; বরং কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশলগত জেদ এবং খেলোয়াড়দের অনাকাঙ্ক্ষিত চোট ও ক্লান্তি—এই দুইয়ের এক মারাত্মক সংমিশ্রণই আর্জেন্টিনার পরাজয় ডেকে এনেছিল। মেসির মতো প্রবীণ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এই আর্জেন্টিনা দল টুর্নামেন্টজুড়ে নকআউট পর্বের কঠিন বাধা পেরিয়ে ফাইনালে এসেছিল, কিন্তু স্পেনের তরুণ ও গতিশীল হাইপার-আগ্রাসী প্রেসিংয়ের সঙ্গে ১২০ মিনিট লড়াই করার মতো শারীরিক শক্তি তাদের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের ছিল না।
আর্জেন্টিনা সাধারণত আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক পাসিং ফুটবলের জন্য পরিচিত। কিন্তু এই ম্যাচে তারা পুরো ১২০ মিনিটে একটিও শট গোলপোস্টে নিতে পারেনি, যা ফাইনালে আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তির কাছ থেকে কেউ আশা করেনি। এভাবে ২৪টি ফাউল এবং এনসো ফের্নান্দেসের লাল কার্ড দলের কৌশলগত দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে; ফুটবল বোদ্ধারা এই প্রবণতাকে ‘নেতিবাচক ফুটবল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ভক্তদের প্রত্যাশা ছিল, লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে কোনো জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেবেন। কিন্তু দলের রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে মেসি পুরো ম্যাচে বলের জোগান পাননি এবং মাঠে তাকে সম্পূর্ণ অসহায় দেখিয়েছে।
আর্জেন্টিনা ম্যাচটি সম্মানজনকভাবেও হারতে পারত। কিন্তু লড়াই না করে এভাবে স্পেনের ফুটবলের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং ফাউল করে ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টাটা ফুটবল বিশ্বের কাছে মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না।