মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় খাদ্যগ্রহণও এর বাইরে নয়। একজন মুমিন খাবার গ্রহণ করেন সুস্থ ও শক্তিশালী থাকার জন্য, যাতে তিনি আল্লাহর হক, বান্দার হক এবং নিজের হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারেন। একই সঙ্গে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনা অনুসরণ করেন।
ইসলামে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি হলো—
১. হালাল ও উত্তম খাবার গ্রহণ
মুমিন খাবার গ্রহণের সময় হালাল ও তাইয়িব তথা উত্তম খাবার বেছে নেবেন। তাইয়িব বলতে এমন খাবারকে বোঝায়, যা হালাল, পবিত্র, উপাদেয়, স্বাস্থ্যকর ও রুচিসম্মত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুলগণ! পবিত্র হালাল বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মানব সম্প্রদায়, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
এ ছাড়া আল্লাহ অপবিত্র ও মন্দ খাবার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (মুহাম্মদ সা.) তাদের জন্য পবিত্র বস্তুগুলো হালাল ঘোষণা করেন এবং অপবিত্র বস্তুগুলো নিষিদ্ধ করেন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭)
২. স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ
খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতিও সচেতন থাকা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। এমন খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বাস্থ্য ও সুস্থতার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, ‘অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে গনিমত মনে কোরো।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৯১৬)
অন্য এক হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার চোখের হক আছে, তোমার শরীরের হক আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮২)
অর্থাৎ ইবাদতের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজন ও সুস্থতার প্রতিও যত্নশীল হওয়া জরুরি।
৩. পরিমিত খাবার গ্রহণ
ইসলাম সব ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রেও অতিভোজন কিংবা অপচয় কোনোটিই কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
তাই সামর্থ্য থাকলেও খাবার নিয়ে অতিরিক্ত ভোগবিলাসে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত খাবার গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
৪. সাধারণ খাবারে সন্তুষ্ট থাকা
খাদ্য নিয়ে অতিরিক্ত বিলাসিতা ও ভোগে মেতে থাকা ইসলাম সমর্থন করে না। সাধারণ ও সহজলভ্য খাবারে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এর বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবারের কাছে তরকারি চাইলেন। তাঁরা জানালেন, তাঁদের কাছে সিরকা ছাড়া আর কিছু নেই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সিরকা আনতে বললেন এবং তা দিয়ে খেতে শুরু করে বললেন, ‘সিরকা কতই না উত্তম তরকারি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৫১)
৫. উদরপূর্তি নয়, অল্পে তুষ্টি
মুমিন খাবার সামনে পেলেই অতিরিক্ত খাওয়ার চেষ্টা করেন না। বরং অল্প খাবারেও সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা গড়ে তোলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুজনের খাদ্য তিনজনের জন্য যথেষ্ট। তিনজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৯২)
হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, এর অর্থ হলো—একজনের পরিতৃপ্তির পরিমাণ খাবার দুজনের ক্ষুধা দূর করতে পারে এবং দুজনের পরিমাণ খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। (ফাতহুল বারি: ৯/৪৪৬)
খাবার গ্রহণ তাই শুধু ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুমিনের আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং খাবারসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।