সন্তান আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান নিয়ামত ও আমানত। সন্তানকে নেককার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইসলাম যেমন সঠিক শিক্ষা, উত্তম চরিত্র ও আদর্শ পরিবেশের নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি বাবা-মায়ের আন্তরিক দোয়াকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, কল্যাণের প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর তঁার কাছেই দোয়ার মাধ্যমে সব ধরনের সফলতা কামনা করতে হয়।
১. নবীদের দোয়ায় সন্তানের কল্যাণের শিক্ষা
কোরআনে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে নবীদের দোয়া উল্লেখ করেছেন। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, Èহে আমার রব! আমাকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদেরও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।' (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)
এখানে লক্ষণীয়, ইবরাহিম (আ.) সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ, রাজত্ব বা পার্থিব প্রাচুর্য চাননি; বরং তাদের ঈমান, সালাত ও আল্লাহর আনুগত্য কামনা করেছেন। কারণ একজন সন্তানের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার সাময়িক অর্জনে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, 'হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।' (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৭৪)
ইমাম ইবন কাসির (রহ.) বলেন, এই আয়াতের অর্থ হলো, সন্তান যেন এমন নেককার হয় যে সন্তানের একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদত, তঁার প্রতি ঈমান এবং আনুগত্য দেখে বাবা-মায়ের অন্তর প্রশান্ত হয়। (তাফসির ইবন কাসির, ৬/১২৬)
জাকারিয়া (আ.) দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পরও নিরাশ হননি। তিনি দোয়া করেছিলেন∏Èহে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে পবিত্র সন্তান দান করুন।' (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩৮)
আল্লাহ তঁার দোয়া কবুল করেন এবং ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ দেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তরিক দোয়া আল্লাহর কাছে কখনোই মূল্যহীন নয়।
২. বাবা-মায়ের দোয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই∏পিতার (সন্তানের জন্য) দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং মজলুম (নির্যাতিত)-এর দোয়া।' (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪৮)
হাদিসে যদিও বিশেষভাবে পিতার কথা এসেছে, তবে আলেমরা স্পষ্ট করেছেন যে এর দ্বারা মায়ের দোয়াও অন্তভর্ুক্ত। আল্লামা আব্দুর রহমান আল-মুবারকপুরি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে পিতার উলে্লখ করা হয়েছে মূলত অভিভাবক হিসেবে; অন্যথায় মায়ের দোয়াও সমানভাবে, বরং বেশি মমতা ও আন্তরিকতার কারণে কবুল হওয়ার আশা করা যায়। (তুহফাতুল আহওয়াজি, ৫/৩৪৩) এ কারণেই যুগে যুগে নেককার মানুষদের জীবনীতে দেখা যায়, তাদের সফলতার পেছনে বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত দোয়া বিরাট ভূমিকা রেখেছে।
৩. সন্তানের জন্য দোয়া ছিল নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু দোয়ার গুরুত্ব বর্ণনা করেননি;তিনি নিজেও শিশুদের জন্য দোয়া করতেন। হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য তিনি এভাবে দোয়া করতেন, 'আমি তোমাদের আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালিমাসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি, প্রত্যেক শয়তান, বিষধর প্রাণী এবং প্রত্যেক বদনজর থেকে।' (বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১) এ থেকে বোঝা যায়, সন্তানের জন্য দোয়া করা কেবল একটি ভালো অভ্যাস নয়; এটি নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ।
৪. সন্তানের বিরুদ্ধে বদদোয়া : ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না। এমন সময়ে তা আল্লাহর কাছে পেৌঁছে যেতে পারে যখন দোয়া কবুল করা হয়; ফলে তা কবুল হয়ে যাবে।' (মুসলিম, হাদিস : ৩০০৯)
বাবা-মায়ের অনেকের একটি বড় ভুল হলো, সন্তানদের কোনো আচরণে রাগান্বিত হলে তারা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করে বসেন। অথচ তাদের উচিত, সন্তানের জন্য হিদায়াতের দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যে তিনি যেন তাদের সংশোধন করে দেন এবং সঠিক পথের প্রেরণা দান করেন।
৫. বর্তমান সময়ে বাবা-মায়ের দোয়ার প্রয়োজনীয়তা
আজকের পৃথিবীতে সন্তানরা নাসি্তক্যবাদ, অশ্লীলতা, মাদক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং নানামুখী ফিতনার মুখোমুখি। এসব বিপদ থেকে কেবল পার্থিব শিক্ষা দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আল্লাহর বিশেষ হেফাজত।
তাই একজন মা যখন সন্তানের জন্য অশ্রুসিক্ত দোয়া করেন কিংবা একজন বাবা সন্তানের ঈমান, হিদায়াত ও নেক জীবনের জন্য প্রার্থনা করেন, তখন সেই দোয়া সন্তানের জন্য রহমত, হিদায়াত ও বরকতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। অনেক সময় এমন একটি আন্তরিক দোয়াই সন্তানের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।