বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা বিবাহবন্ধনকে ‘মিসাকান গালিজা’—অত্যন্ত দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসে থাকায় পাত্র-পাত্রীর একজন বা উভয়জন ভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। ফলে সরাসরি বিয়ের মজলিসে উপস্থিত হওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। এ কারণে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা নিয়ে অনেকের আগ্রহ রয়েছে।
ইসলামী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, বিয়ের আকদ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ইজাব-কবুল, সাক্ষী এবং একই মজলিসে আকদ সম্পাদনসহ প্রযোজ্য শরিয়াহর শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা জরুরি। বিশেষ করে হানাফি ফিকহে একই মজলিসে ইজাব-কবুল ও সাক্ষীদের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে দূরদেশে অবস্থানকারী পাত্র-পাত্রীর জন্য সরাসরি ভিডিও কলে ইজাব-কবুল করার পরিবর্তে উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করে তার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করাকে অধিক নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উকিলের মাধ্যমে যেভাবে বিয়ে হতে পারে
ধরা যাক, বর সৌদি আরব, কাতার, যুক্তরাজ্য কিংবা অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন এবং কনে বাংলাদেশে। এ ক্ষেত্রে বর বিদেশে থেকেই নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে নিজের পক্ষ থেকে বিয়ের উকিল নিয়োগ করতে পারেন।
এরপর দেশে বিয়ের মজলিসে কনের ওলি বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নির্ধারিত মহরের বিনিময়ে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। বরের নিযুক্ত উকিল তার পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন। এ সময় শরিয়তের নির্ধারিত সাক্ষীদের উপস্থিত থাকতে হবে এবং তারা ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে শুনবেন। এভাবেই আকদ সম্পন্ন করা যেতে পারে।
আরেকটি পদ্ধতিতে কনের পিতা বা শরিয়তসম্মতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অভিভাবক বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিকে নিজের পক্ষের উকিল করতে পারেন। এরপর সেই উকিল বরের উপস্থিতিতে নির্ধারিত সাক্ষীদের সামনে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন এবং বর তা কবুল করবেন। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে এভাবেও বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে।
শুধু ভিডিও কলে বিয়ে কি করা যাবে?
হানাফি ফিকহের আলোচনায় দূরবর্তী দুই স্থানে অবস্থান করে শুধু ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি ইজাব-কবুল করাকে বিয়ের নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। কারণ বিয়ের মজলিস, সাক্ষী ও ইজাব-কবুলের শর্ত যথাযথভাবে পূরণ হয়েছে কি না—এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রবাসে থাকা ব্যক্তির বিয়ে করা সম্ভব নয়। বরং উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে শরিয়াহর প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়।
মেসেজ বা ই-মেইলে বিয়ে?
শুধু মেসেজ, ই-মেইল বা লিখিত বার্তার মাধ্যমে নিজেরা বিয়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করাও নিরাপদ নয়। কারণ এক্ষেত্রে প্রেরকের পরিচয়, ইজাব-কবুলের মজলিস এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় শরিয়াহসম্মতভাবে নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
ফিকহের গ্রন্থে লিখিত ইজাবের বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য এ ধরনের জটিল পদ্ধতি নিজেরা প্রয়োগ না করে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির তত্ত্বাবধানে আকদ সম্পন্ন করাই অধিক নিরাপদ।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
প্রবাসী পাত্র-পাত্রীর বিয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
১. বিয়ের উকিল কে হচ্ছেন, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
২. উকিল নিয়োগকারী ব্যক্তি সত্যিই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মহরের পরিমাণ আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত।
৪. বিয়ের মজলিসে নির্ধারিত সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ইজাব ও কবুলের শব্দ স্পষ্ট হতে হবে।
৬. কনের ওলি বা তার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি শরিয়াহ অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
৭. শুধু ভিডিও কলে বর-কনের কথোপকথনকে বিয়ের আকদ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
৮. মেসেজ বা ই-মেইলের মাধ্যমে নিজেরা বিয়ে সম্পন্ন করার পরিবর্তে অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অতএব, প্রবাসে থাকা পাত্র-পাত্রীর বিয়ের ক্ষেত্রে ভিডিও কল ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে উকিল নিয়োগ করা যেতে পারে। এরপর উকিল, ওলি ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একই মজলিসে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করাই অধিক নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।-----