শহুরে ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ কমে গেছে অনেকেরই। সারাদিন ঘর, অফিস, যানজট আর কৃত্রিম আলোয় কাটে সময়। অথচ গাছপালা, খোলা আকাশ, পাখির ডাক কিংবা মাটির সংস্পর্শে কিছুটা সময় কাটানো শরীর ও মনের জন্য হতে পারে বেশ উপকারী।
পার্কে হাঁটতে গিয়ে মন ভালো হয়ে যাওয়া কিংবা গাছপালায় ঘেরা জায়গায় বসে অজান্তেই স্বস্তি অনুভব করা নিছক কাকতালীয় নয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলে শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা মানসিক চাপ কমানো থেকে শুরু করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আর এ জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রকৃতির মধ্যে থাকার প্রয়োজন নেই। দিনের ব্যস্ততার মাঝেও অল্প কিছু সময় সবুজের কাছে কাটানো উপকারী হতে পারে।
প্রকৃতি দেখলেই শরীর শান্ত হতে শুরু করে
সবুজ গাছপালা দেখা, পাতার মর্মরধ্বনি শোনা, পাখির ডাক কিংবা গাছের মৃদু গন্ধ—প্রকৃতির এসব উপাদান আমাদের শরীরের স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। এই স্নায়ুতন্ত্র হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো শরীরের অনৈচ্ছিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক অধ্যাপক ব্যারনেস ক্যাথি উইলিসের মতে, প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটালে রক্তচাপ কমতে পারে, হৃদস্পন্দন ধীর হতে পারে এবং হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক ওঠানামায় পরিবর্তন আসতে পারে। এগুলো শরীরের শিথিল হওয়ার লক্ষণ।
অর্থাৎ কাছের কোনো পার্কে গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটা কিংবা গাছের ছায়ায় বসে থাকাও শরীরকে মানসিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত করতে পারে।
সপ্তাহে দুই ঘণ্টা সবুজের মধ্যে
যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতি সপ্তাহে মোট অন্তত ১২০ মিনিট বা দুই ঘণ্টা সবুজ পরিবেশে কাটান, তারা নিজেদের স্বাস্থ্য ভালো এবং মানসিক সুস্থতা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন।
এই সময় একটানা কাটাতে হবে এমন নয়। সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে অল্প অল্প করে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটালেও তা মোট সময়ের অংশ হতে পারে।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কের সম্ভাব্য উপকারের কারণে যুক্তরাজ্যের কিছু এলাকায় ‘গ্রিন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কমতে পারে মানসিক চাপের হরমোন
প্রকৃতির প্রভাব শুধু চোখ ও মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শরীরের হরমোন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটালে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো মানসিক চাপ-সংশ্লিষ্ট হরমোনের মাত্রা কমতে পারে। এসব হরমোন সাধারণত উদ্বেগ, ভয় কিংবা চাপের সময় বেড়ে যায়।
জাপানি সাইপ্রেস বা হিনোকি গাছের সুগন্ধ নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, এর তেল থেকে তৈরি সুগন্ধি গ্রহণের পর অংশগ্রহণকারীদের অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা কমে এবং রক্তে ‘ন্যাচারাল কিলার’ কোষের পরিমাণ বেড়ে যায়। শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসব কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিং কুও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ইতিবাচক সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দীর্ঘ সময় প্রকৃতির মধ্যে থাকার পর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এ ধরনের গবেষণার ফলকে সব মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার স্বাস্থ্যগত উপকারের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকৃতির উপকার নিয়ে আরও গবেষণা চলছে।
প্রকৃতির গন্ধেও আছে প্রশান্তি
প্রকৃতির উপকার শুধু সবুজ দেখা বা খোলা বাতাসে হাঁটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাছপালা ও মাটির গন্ধও শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
উদ্ভিদ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া নানা জৈব যৌগ শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পাইনগাছের গন্ধ এর একটি উদাহরণ।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পাইনবনের গন্ধ অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষকে শান্ত করতে পারে। এই প্রভাব কিছু সময় স্থায়ীও হতে পারে।
অর্থাৎ প্রকৃতির গন্ধ আমাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যা শরীরকে শিথিল হতে সাহায্য করে।
মাটির সংস্পর্শে মিলতে পারে উপকার
প্রকৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাটি ও উদ্ভিদের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শ।
মাটি ও গাছপালায় অসংখ্য অণুজীব রয়েছে। এর কিছু মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে এবং শরীরের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ক্রিস ভ্যান টুলেকেন প্রকৃতিকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের ইতিবাচক উদ্দীপনা হিসেবে দেখেন। প্রকৃতির বিভিন্ন অণুজীবের সংস্পর্শ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অপরিষ্কার বা দূষিত মাটির সঙ্গে ইচ্ছেমতো সংস্পর্শে আসা নিরাপদ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে?
প্রতিদিন পার্ক বা বনে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে প্রকৃতির কিছুটা উপস্থিতি ঘরেও তৈরি করা যায়।
ঘরে গাছ রাখা, ফুল সাজানো, জানালা দিয়ে সবুজ গাছপালার দিকে তাকানো কিংবা কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে থাকা—এসবও মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির ছবির দিকেও তাকালে মস্তিষ্কে কিছু প্রশান্তিদায়ক পরিবর্তন হতে পারে। অর্থাৎ বাস্তব প্রকৃতির কাছে যেতে না পারলেও তার দৃশ্যমান উপস্থিতি কিছুটা উপকার দিতে পারে।
ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতির জন্য সময় রাখুন
প্রকৃতির সান্নিধ্য কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। তবে সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এটি একটি সহজ ও স্বাভাবিক অভ্যাস হতে পারে।
প্রতিদিনের রুটিনে ছোট কিছু পরিবর্তন আনা যায়। অফিসের বিরতিতে কাছের পার্কে হাঁটা, বাসার ছাদে গাছের পরিচর্যা করা, সকালে কিছুক্ষণ খোলা আকাশের নিচে থাকা কিংবা সপ্তাহান্তে পরিবার নিয়ে সবুজ কোনো জায়গায় সময় কাটানো—সবই হতে পারে ভালো অভ্যাস।
দীর্ঘ সময়ের প্রকৃতিভ্রমণের সুযোগ না থাকলেও তাই হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নিয়মিত অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির কাছে যান।
কারণ, সুস্থ থাকার জন্য সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো গাছের ছায়ায় কাটানো কয়েকটি মুহূর্তও হতে পারে শরীর ও মনের জন্য বড় উপকারের শুরু।