বুধবারবাংলা: ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দইংরেজি: ৭ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দহিজরি: ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

কবরেও শান্তি নেই, স্বজনের শেষ ঠিকানা রক্ষায় বাড়ছে খরচ

কবরেও শান্তি নেই, স্বজনের শেষ ঠিকানা রক্ষায় বাড়ছে খরচ
সংবাদটি শুনুন AI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
ঢাকা শহরে কবরের জায়গার সংকট তীব্র। সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর; দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে গুনতে হয় লাখ থেকে কোটি টাকা। এর মধ্যে কবরকেন্দ্রিক অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার সেই আকুতি—‘এই খানে তোর দাদির কবর, ডালিম গাছের তলে’—বাংলার মানুষের কাছে কবরকে শুধু একটি সমাধিস্থল নয়, স্মৃতি ও শিকড়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার বাস্তবতায় প্রিয়জনের কবরের সেই স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রায় তিন কোটি মানুষের এই শহরে সরকারি কবরস্থান রয়েছে মাত্র ১৩টি। এসব কবরস্থানের মোট আয়তন ২৫৩ একর। জায়গার সংকটের কারণে সাধারণ কবর নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে স্বজনের কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে পরিবারগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

কোথাও মাসে মাসে টাকা দিয়ে কবরের পরিচর্যা ও চিহ্ন অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা চলছে, আবার কোথাও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য দিতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা। ফলে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে প্রিয়জনের কবর কতদিন সংরক্ষিত থাকবে।

দাফনের পরও খরচ

২০২৫ সালের এপ্রিলের ঘটনা। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম মারা গেলে তাঁর স্বজনরা মরদেহ নিয়ে যান জুরাইন কবরস্থানে। সে সময় সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দাফন ফি ছিল এক হাজার টাকা।

তবে পরিবারের অভিযোগ, দাফন সম্পন্ন করতে তাঁদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। কাঠের নামফলকের জন্য নেওয়া হয় ৩০০ টাকা। কবর সাজানো ও সাময়িক সংরক্ষণের কথা বলে নেওয়া হয় আরও এক হাজার টাকা। এরপর কবরটি অক্ষত রাখার জন্য প্রতি মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।

রফিকুল ইসলামের স্বজন আহাদুজ্জামানের ভাষ্য, মাসিক টাকা দেওয়া বন্ধ করলে কবরের মাটি সমান করে সেখানে অন্য মরদেহ দাফন করা হতে পারে—এমন কথাও তাঁদের জানানো হয়েছিল।

তবে এসব অর্থ আদায়ের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কবর ঘিরে অনানুষ্ঠানিক চক্র

কবরস্থানগুলোতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও খাটোলি থাকলেও বিভিন্ন কবরস্থানে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে। অনুসন্ধানে কোনো কোনো কবরস্থানে ১০০ থেকে ১৫০ জনের এমন একটি চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তাঁদের সরকারি নিয়োগ নেই। নিজেদের ‘সহায়ক কর্মী’ পরিচয়ে দাফন থেকে শুরু করে কবরের পরিচর্যার বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিতে দুই হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা, কবর সাজানো বা ঘাস লাগাতে প্রায় এক হাজার টাকা এবং নিয়মিত পানি দেওয়া ও পরিচর্যার জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়।

রায়েরবাজার কবরস্থানে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মী স্বজনদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এই আয়ের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মীদের কাছেও যায়। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

নীতিমালায় কী আছে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২ অনুযায়ী, সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত জায়গাটি ব্যবহারের বিধান রয়েছে। সাধারণ কবরের ওপর বাঁশ, ইট, লোহার গ্রিল বা অন্য কোনো উপায়ে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বা বেড়া দেওয়ার সুযোগও নেই।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, নিয়মিত কবর দেখতে না গেলে কিংবা পরিচর্যার জন্য টাকা দেওয়া বন্ধ হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই কবরের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই কবর সমান করে সেখানে নতুন মরদেহ দাফনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া পুরনো কবর থেকে হাড়গোড় ও কঙ্কাল চুরি এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব কর্মকাণ্ডে কবরস্থানকেন্দ্রিক অসাধু চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে লাখ থেকে কোটি টাকা

অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নীতিমালা অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দিতে হয় এক কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে এই হার যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও এক কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ এবং উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে একই মেয়াদের জন্য দিতে হয় ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা।

তবে বাস্তবে সংরক্ষণের খরচ আরও বেশি হতে পারে বলে জানা গেছে। বনানী কবরস্থানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে। একই কবরে পরিবারের অন্য সদস্যকে পুনঃদাফনের ক্ষেত্রে কবরস্থানভেদে ৩০ হাজার ৫০০ থেকে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃদাফনের সুযোগ মৃত ব্যক্তির ছেলে-মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা এবং ভাই-বোনের মধ্যে সীমিত।

ঢাকা দক্ষিণেও সংরক্ষণে বড় অঙ্কের অর্থ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোতেও স্থায়ীভাবে কবরের জমি কেনার সুযোগ নেই। মেয়াদ অনুযায়ী কবর সংরক্ষণে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

১০ বছরের জন্য পাঁচ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

এই ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবু রায়হান জানান, তিন বছর আগে তাঁর খালু আব্দুল আলী মারা গেলে ঢাকায় দাফনের ইচ্ছা থাকলেও কবর সংরক্ষণের ব্যয় বহন করতে না পারায় তাঁকে কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

দুই দশকে বেড়েছে সংরক্ষণ ব্যয়

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে বনানী ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো এক লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জায়গা পাওয়া যেত ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।

২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কবরের জায়গা কেনা বন্ধ ছিল। ২০০৮ সাল থেকে চালু হয় মেয়াদভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা।

২০২৩ সালে ফি বাড়ানোর আগে বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য সর্বোচ্চ সংরক্ষণ ফি ছিল ২৪ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৪৫ লাখ টাকা। বর্তমানে নীতিমালায় এই হার যথাক্রমে এক কোটি ও দেড় কোটি টাকা।

ডিএনসিসির অধীন সাতটি কবরস্থানে অগ্রিম কবর সংরক্ষণও এখন বন্ধ। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও জায়গা থাকা সাপেক্ষে ১৫ বা ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

ফি বাড়ানোর ব্যাখ্যা ডিএনসিসির

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান বলেন, সাধারণভাবে কবর দেওয়ার খরচ বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের ক্ষেত্রেই উচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে করা নীতিমালা অনুযায়ী ফি নেওয়া হচ্ছে। নতুন করে কোনো ফি বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতেই ফি বাড়ানো হয়েছে, কারণ সবাই কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ঢাকায় কবরের জায়গার সংকট আরও বাড়বে।

তবে কর্মকর্তার বক্তব্যে ২০২৩ সালের নীতিমালার কথা বলা হলেও নথিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’। নীতিমালাটি ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।

জায়গার সংকটেই পুনর্ব্যবহার

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১৩টি সরকারি কবরস্থানের মোট আয়তন ২৫৩ একর। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় ১৯২ একর এবং ঢাকা দক্ষিণে ৬১ একর। এসব কবরস্থানে মোট দাফন সক্ষমতা দুই লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জন।

জায়গার সংকট সবচেয়ে বেশি বনানী কবরস্থানে। সেখানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে এবং নতুন দাফনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে সাধারণ কবর নির্ধারিত সময় পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। সংরক্ষিত কবরে পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফনের নজিরও রয়েছে; কোনো কোনো কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।

ডিএনসিসির ভাষ্য, অতীতে জীবিত অবস্থায় কবরের জায়গা কিনে রাখার সুযোগ থাকায় সংকট আরও বেড়েছিল। বর্তমানে বনানীতে আগাম কবর সংরক্ষণের সেই সুযোগ বন্ধ রয়েছে।

কবরের জায়গা নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। ২০০৬ সালে আজিমপুর কবরস্থানের শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী কবর ভেঙে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে হাইকোর্ট কবর ভেঙে সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা করেন।

কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্তও হয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীতে মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানাটুকুও যেন ক্রমেই হয়ে উঠছে দুর্লভ। সীমিত জায়গা, উচ্চ সংরক্ষণ ব্যয় এবং কবরকেন্দ্রিক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন একটাই—প্রিয়জনের কবরের স্মৃতি কতদিন নিরাপদ থাকবে?
নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নাশকতার অপচেষ্টা চলছে: রিজভী

সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নাশকতার অপচেষ্টা চলছে: রিজভী

নিজস্ব প্রতিনিধি
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা প্রোব এআই সহকারী

প্রস্তুত আছেন
নমস্কার / আসসালামু আলাইকুম! আমি ঢাকা প্রোব এআই সহকারী। আজকের যেকোনো খবর জানতে মুখে বলুন বা লিখুন।