মুক্তা প্রকৃতির এক বিস্ময়। পৃথিবীর মূল্যবান রত্নগুলোর মধ্যে এটি অনন্য। কারণ, মুক্তা কোনো ভূগর্ভস্থ পাথর বা খনিজ থেকে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় একটি জীবন্ত প্রাণীর শরীরে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ায় ঝিনুকের ভেতরে জন্ম নেয় এই রত্ন।
যুগে যুগে রাজা-বাদশা, সম্রাট ও অভিজাতদের কাছে মুক্তা ছিল ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক।
যেভাবে তৈরি হয় মুক্তা
মুক্তার সৃষ্টি মূলত ঝিনুকের আত্মরক্ষার একটি প্রক্রিয়া। সাগর, নদী বা জলাশয়ে থাকা ঝিনুকের খোলসের ভেতরে কখনো বাইরের কোনো বস্তু ঢুকে পড়ে। সেটি হতে পারে বালুকণা, পরজীবী কিংবা ছোট কোনো খাদ্যকণা।
এতে ঝিনুক অস্বস্তি বোধ করে। তখন তার নরম টিস্যু বা ‘ম্যান্টল’ থেকে বিশেষ এক ধরনের পদার্থ নিঃসৃত হয়। এর নাম ‘ন্যাকে’ (Nacre)।
ঝিনুক ধীরে ধীরে ওই অনুপ্রবেশকারী কণার ওপর ন্যাকে-এর পাতলা স্তর জমাতে থাকে। একটির ওপর আরেকটি স্তর জমতে থাকে। বছরের পর বছর ধরে হাজারো স্তর তৈরি হয়। একসময় তা রূপ নেয় মসৃণ ও উজ্জ্বল মুক্তায়।
প্রকৃতির এই প্রক্রিয়ায় তৈরি মুক্তাকে আলাদা করে কাটিং বা পালিশ করতে হয় না। তার সৌন্দর্য তৈরি হয় ঝিনুকের শরীরের ভেতরেই।
রাজা-বাদশাদের এত পছন্দের কারণ
প্রাচীনকাল থেকেই মুক্তাকে অভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। রাজকীয় ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা প্রকাশে রাজা-বাদশারা মুক্তার অলংকার ব্যবহার করতেন।
মিশরের শেষ রানি ক্লিওপেট্রার মুক্তার প্রতি অনুরাগের কথা ইতিহাসে বহুল আলোচিত। কথিত আছে, এক বাজিতে রোমান সেনাপতি মার্ক অ্যান্টোনিওকে নিজের বিপুল সম্পদের পরিচয় দিতে তিনি একটি বড় ও মূল্যবান প্রাকৃতিক মুক্তা ভিনেগারে গুলে পান করেছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের শেখ, রোমান সম্রাট এবং ভারতবর্ষের মোগল ও রাজস্থানের রাজপরিবারেও মুক্তার বিশেষ কদর ছিল। তাঁরা মুক্তাকে শুধু অলংকার হিসেবে দেখতেন না। এর সঙ্গে পবিত্রতা, সুরক্ষা ও অমরত্বের মতো ধারণাও যুক্ত ছিল।
রোমান সাম্রাজ্যে মুক্তার চাহিদা ছিল ব্যাপক। ইতিহাসবিদদের দাবি, রোমান জেনারেল ভিটেলিয়াস তাঁর মায়ের একটি মুক্তার কানের দুল বিক্রি করে একটি পুরো সামরিক অভিযানের খরচ মেটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কেন এত দামি
মুক্তার দামের অন্যতম কারণ এর দুর্লভতা। হাজার হাজার ঝিনুকের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে নিখুঁত ও সুন্দর আকৃতির প্রাকৃতিক মুক্তা পাওয়া খুবই কঠিন।
বিশেষ করে বড়, গোলাকার ও উজ্জ্বল মুক্তা অত্যন্ত বিরল। একটি বড় প্রাকৃতিক মুক্তা তৈরি হতে ঝিনুকের কয়েক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
প্রাকৃতিক মুক্তা সংগ্রহও একসময় ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সমুদ্রের তলদেশ থেকে ডুবুরিদের ঝিনুক সংগ্রহ করতে হতো। বর্তমানে খাঁটি প্রাকৃতিক মুক্তার জোগানও অনেক কমে গেছে।
তেল উত্তোলন, পরিবেশদূষণ ও অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে প্রাকৃতিক মুক্তা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বিরলতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে এর মূল্যও বেশি।
সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া মুক্তা
নিলামের ইতিহাসে বেশ কিছু মুক্তা বিপুল দামে বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি হলো ফ্রান্সের রানি মারি অ্যান্টোইনেটের মুক্তার প্যান্ডেন্ট।
২০১৮ সালে জেনেভায় সোথেবিসের নিলামে ঐতিহাসিক এই মুক্তার প্যান্ডেন্ট প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি।
আরেকটি বিখ্যাত মুক্তা হলো ‘লা পেরগ্রিনা’। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর সঙ্গে স্পেন ও ইউরোপের রাজপরিবারের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। পরে মুক্তাটি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন হলিউড অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলর।
২০১১ সালে ক্রিস্টিসের নিলামে ‘লা পেরগ্রিনা’ প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। এতে বোঝা যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও মুক্তার আকর্ষণ কমেনি।
প্রাকৃতিক ও কালচারড মুক্তার পার্থক্য
বর্তমানে বাজারে পাওয়া অধিকাংশ মুক্তা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি নয়। এগুলোকে বলা হয় ‘কালচারড মুক্তা’ বা চাষ করা মুক্তা।
এই পদ্ধতিতে মানুষের উদ্যোগে ঝিনুকের শরীরের ভেতরে একটি বস্তু বা টিস্যু প্রবেশ করানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট পরিবেশে ঝিনুককে পানিতে প্রতিপালন করা হয়।
ঝিনুক স্বাভাবিকভাবেই ওই বস্তুটির চারপাশে ন্যাকে জমাতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় কালচারড মুক্তা।
কালচারড মুক্তাও ঝিনুকের তৈরি এবং গয়নার বাজারে এটি বেশ জনপ্রিয়। তবে বিরল প্রাকৃতিক মুক্তার সঙ্গে এর ঐতিহাসিক ও আর্থিক মূল্যের পার্থক্য রয়েছে।
আধুনিক সময়ে কালচারড মুক্তা মুক্তাকে সহজলভ্য করেছে। তবু জীবন্ত প্রাণীর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সেই দুর্লভ রত্নের আলাদা আকর্ষণ এখনো অটুট।