সোমবারবাংলা: ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দইংরেজি: ৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দহিজরি: ২২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু
বেরোবির প্রশাসনে এক ব্যক্তির দাপট

একজনই ছয় দায়িত্বে, পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

একজনই ছয় দায়িত্বে, পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
সংবাদটি শুনুন AI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) এক শিক্ষক একই সঙ্গে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক। পাশাপাশি তিনি সিন্ডিকেট সদস্য, কর্মকর্তা নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সদস্য এবং কর্মচারী নিয়োগের আবেদন বাছাই কমিটির আহ্বায়ক।

ওই শিক্ষক হলেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান।

একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, এতে প্রশাসনিক ক্ষমতা একজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভারসাম্য ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যেভাবে ছয় দায়িত্বে ফেরদৌস রহমান
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র অনুযায়ী, ফেরদৌস রহমান ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রক্টরের দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে বহিরাঙ্গন কার্যক্রম বা অফিস অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব নেন।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি তাঁকে পরিচালক শ্রেণির সিন্ডিকেট সদস্য করা হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি কর্মকর্তা নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সদস্য হন। কর্মচারী নিয়োগের আবেদন বাছাই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

আগামীকাল ২২ সেপ্টেম্বর প্রক্টর হিসেবে তাঁর দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

সিন্ডিকেট সদস্য করা নিয়েও প্রশ্ন
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইনের ২১ ধারায় সিন্ডিকেটের সদস্যসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ধারাটির ১-এর (ট) উপধারায় বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট থেকে পালাক্রমে মনোনীত দুজন পরিচালক সিন্ডিকেট সদস্য হবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একই আইনে ‘পরিচালক’ বলতে ইনস্টিটিউটের পরিচালককে বোঝানো হয়েছে।

এ কারণে বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালককে ‘পরিচালক শ্রেণির’ সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকেরা।

তাঁদের অভিযোগ, মূলত সিন্ডিকেটের সদস্য করার সুযোগ তৈরি করতেই ফেরদৌস রহমানকে বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ফেরদৌস রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অধ্যাপক
ফেরদৌস রহমানের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী, পিএইচডি ডিগ্রিধারী কোনো শিক্ষককে অধ্যাপক হতে হলে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মোট ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

ফেরদৌস রহমান ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সহযোগী অধ্যাপক হন। সে হিসাবে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।

কিন্তু চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

অর্থাৎ সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রায় এক বছর আগেই তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান।

‘বিশেষ সুবিধা’ পুনর্বহালের পর পদোন্নতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল সিন্ডিকেটের ৯৪তম বিশেষ সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) করা শিক্ষকদের পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সিন্ডিকেটের ১০১তম সভায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা—নির্দিষ্ট পদে চাকরিকালসহ অন্যান্য সুবিধা—বাতিল করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ১১৫তম সভায় ওই বিশেষ সুবিধা আবারও বহাল করা হয়। এরপরই ফেরদৌস রহমান অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান।

পুনর্বহাল করা বিধির আওতায় অতিরিক্ত প্রকাশনার জন্য তিনি এক বছরের রেয়াত নেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে।

তবে শিক্ষকদের দাবি, এই রেয়াত মোট ১২ বছরের চাকরিকাল পূরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে; সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখা সূত্র বলছে, পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক পদে প্রতি তিন বছরের কর্ম-অভিজ্ঞতার জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সময় ফেরদৌস রহমানের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল ১ বছর ৪ মাস ১১ দিন।

এ কারণে তাঁকে দেওয়া রেয়াতের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

‘নীতিমালার বাইরে কিছু হয়নি’
অভিযোগের বিষয়ে ফেরদৌস রহমানের বক্তব্য ভিন্ন।

গত ১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘নীতিমালার বাইরে কোনো কিছুই হয়নি। নীতিমালার মধ্যেই সবকিছু হয়েছে।’

তবে তাঁর পদোন্নতির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার থাকা হারুন অর রশিদ এ বিষয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন।

সাবেক রেজিস্ট্রারের অভিযোগ।
হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, নীতিমালা লঙ্ঘন করেই ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর অভিযোগ, ফেরদৌস রহমানকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সিন্ডিকেটের ১০১তম সভার একটি সিদ্ধান্ত পরবর্তী আরেকটি সিন্ডিকেট সভার কার্যপত্রে বাতিল দেখিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ যে সভায় ওই সিদ্ধান্ত বাতিল দেখানো হয়েছে, সেখানে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট সভার কার্যপত্র বা অন্য কোনো নথি প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

একই যোগ্যতায় আবেদন করেও পদোন্নতি পাননি অন্যরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, যে বিধি সংশোধন করে ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, একই যোগ্যতা নিয়ে আবেদন করেও অন্য কয়েকজন শিক্ষক পদোন্নতি পাননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল লতিফ বলেন, অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য তিনি এবং আরও কয়েকজন শিক্ষক সব বিধি মেনে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

‘এতগুলো দায়িত্ব একজনের হাতে থাকা বিরল’
একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১০ জন শিক্ষক।

তাঁদের ভাষ্য, যোগ্যতা পূরণের আগেই একজন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে তাঁকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হক বলেন, ‘একজন ব্যক্তিকে এত পদে–দায়িত্বে রাখা বিরল ঘটনাই বলব। অন্য অধ্যাপকদের দায়িত্ব না দিয়ে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদ একজনের ধরে রাখার বিষয়টি নৈতিকতাবিরোধীও।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেদের অভিযোগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রশ্নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঢাকা প্রোব এআই সহকারী

প্রস্তুত আছেন
নমস্কার / আসসালামু আলাইকুম! আমি ঢাকা প্রোব এআই সহকারী। আজকের যেকোনো খবর জানতে মুখে বলুন বা লিখুন।