ট্রফিটা হাতে ওঠেনি। কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে লিওনেল মেসি খালি হাতে ফেরেননি— বরং ফিরেছেন ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লিখে। ৩৯ বছর বয়সে এসে যে পারফরম্যান্স তিনি দেখিয়েছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। আর্জেন্টিনা রানার্স-আপ হলেও, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের বিচারে এই বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা টুর্নামেন্ট হিসেবেই থেকে যাবে।
গোটা আসরে মেসি করেছেন ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট— সব মিলিয়ে ১২টি গোলে সরাসরি অবদান। ৮ ম্যাচের মধ্যে ৫ ম্যাচেই জিতেছেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। সবচেয়ে বেশি ২১টি কি-পাস আর ২৫টি বড় সুযোগ তৈরি করে প্রমাণ করেছেন, বয়স তাঁর সৃজনশীলতাকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি।
আসল চমক লুকিয়ে আছে রেকর্ড বইয়ে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ৮ অ্যাসিস্টের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১২ অ্যাসিস্টের মালিক। টানা ১১ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্টে অবদান রাখার নজিরও এখন তাঁরই দখলে— যা আগে কেউ করে দেখাতে পারেননি। আর ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করে তিনি হয়েছেন এই কীর্তির প্রথম মালিক।
সংখ্যার হিসেবে মেসি এখন সর্বাধিক ৩৩ ম্যাচ খেলা এবং সর্বাধিক ২৩ জয়ের রেকর্ডধারী। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনাল খেলে তিনি হয়ে গেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড ফাইনালিস্ট।
যা হাতছাড়া হল
তবে বিশ্লেষণটা একপেশে হবে না, যদি না বলা হয় কী কী মিস হলো। গোল্ডেন বুট গেছে ১০ গোল করা কিলিয়ান এমবাপের ঘরে; মেসি থামলেন ৮ গোলে, সিলভার বুট নিয়ে। ফাইনালে গোল করতে পারলে যৌথ বা এককভাবে শীর্ষ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ ছিল— সেটি হয়নি।
গোল্ডেন বলের দৌড়েও তিনি ছিটকে গেছেন ফাইনালে হারের কারণে; পুরস্কারটি জিতেছেন স্পেনের রদ্রি। ফলে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগও হাতছাড়া হলো।
সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বোধহয় গোলসংখ্যার হিসাবে। বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল এখন ২১টি— মিরোস্লাভ ক্লোজার রেকর্ডের সমান। ফাইনালে একটি গোল করলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলতেন ক্লোজাকে, দুটি করলে হয়ে যেতেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। গোলহীন ফাইনাল সেই সুযোগও কেড়ে নিল।
আর সবচেয়ে বড় প্রতীকী ক্ষতি— ট্রফি। ইতিমধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৫টি অফিশিয়াল শিরোপার মালিক মেসি এই বিশ্বকাপ জিতলে সংখ্যাটা দাঁড়াত ৪৬-এ, যা তাঁকে নিয়ে যেত আরও অননুকরণীয় উচ্চতায়। পেলের পর টানা দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে ঐতিহাসিক কীর্তি গড়ার হাতছানি ছিল, তা-ও অধরাই থেকে গেল।
এক আবেগঘন সমাপ্তি
ম্যাচ শেষে রানার্স-আপ মেডেল গলায় নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়েন মেসি— যা বিশ্বকাপে তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল। কারণ তিনি আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ফুটবল বিশ্ব এই দৃশ্যকে মিলিয়ে দেখছে ২০১৪ সালের মারাকানায় জার্মানির কাছে হারের পর মেসির সেই বিষণ্ণ দৃষ্টির সঙ্গে।
তবে পার্থক্যটা স্পষ্ট। ২০১৪ সালে মেসির হাতে কোনো বিশ্বকাপ ছিল না। ২০২৬ সালে তিনি ফিরছেন এমন একজন হিসেবে, যিনি ইতিমধ্যে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকা জিতে নিজের নাম ইতিহাসে খোদাই করে ফেলেছেন। তাই এবারের হার তাঁর ক্যারিয়ারের গায়ে কোনো অতৃপ্তির দাগ কাটবে না— বরং যোগ করবে আরেকটি অধ্যায়, যেখানে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি প্রমাণ করলেন কেন তিনি সময়ের সীমানা অতিক্রম করা এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা।
মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো অবসরের ঘোষণা দেননি। কিন্তু মাঠের বাইরে যাওয়ার সেই দৃশ্যই যেন বলে দিচ্ছিল— আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে এটিই ছিল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়।