অনেক অভিভাবকেরই অভিযোগ, স্কুল থেকে ফিরে সন্তান দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলতে চায় না। ‘আজ দিন কেমন গেল?’—এমন প্রশ্নের জবাবে অনেক শিশুই শুধু ‘ভালো’ বলে কথোপকথন শেষ করে দেয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা কিছু শেয়ার করতে চায় না। বরং দিনের নানা অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিস্থিতি ও পড়াশোনার চাপের কারণে অনেক সময় শিশুরা বাড়ি ফিরে কিছুটা চুপ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানকে কথা বলাতে জোর করার পরিবর্তে তার সঙ্গে নিরাপদ ও স্বস্তির সম্পর্ক তৈরি করা বেশি কার্যকর। আচরণ বিশ্লেষক, শিক্ষক ও মা জেনা মাজিলো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এমন কিছু কৌশল শেয়ার করেছেন, যা সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তার মতে, শিশুরা স্কুলে দিনের বড় একটি সময় নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিয়ম বোঝা এবং নানা প্রত্যাশা পূরণে ব্যয় করে। তাই বাড়িতে ফেরার পর তারা ক্লান্ত বা মানসিকভাবে চাপে থাকতে পারে।
সন্তানকে স্বাভাবিকভাবে নিজের কথা বলতে উৎসাহিত করার জন্য জেনার পরামর্শ—
১. স্কুল থেকে ফিরলেই ‘দিন কেমন গেল?’ প্রশ্ন করবেন না
অনেক বাবা-মা সন্তান বাড়ি ফিরলেই জিজ্ঞেস করেন, ‘আজ স্কুল কেমন ছিল?’ তবে জেনা বলেন, এতে অনেক শিশু শুধু ছোট উত্তর দিয়ে কথোপকথন শেষ করতে চায়।
এর পরিবর্তে তিনি প্রথমে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রকাশ করেন।
যেমন—‘তোমাকে দেখে ভালো লাগছে’, ‘আমি তোমাকে মিস করেছি’ বা ‘তোমার কথা মনে পড়ছিল’।
তার মতে, স্কুলে দীর্ঘ সময় নানা সামাজিক ও শিক্ষাগত চাপ সামলানোর পর শিশুর প্রয়োজন হয় কিছুটা স্বস্তি ও সংযোগের অনুভূতি। তাই শুরুটা হওয়া উচিত প্রশ্ন দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে।
২. সন্তানের পছন্দের কাজে অংশ নিন
সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর আরেকটি উপায় হলো তার জগতে কিছুটা সময় কাটানো।
জেনা বলেন, তার মেয়ে যদি বন্ধুত্বের ব্রেসলেট তৈরি করে, তিনিও তার সঙ্গে বসে সেটি তৈরি করেন।
মেয়ে গান গাইলে মন দিয়ে শোনেন, আবার ছবি আঁকলে তিনিও রং হাতে তুলে নেন।
এ সময় তিনি অতিরিক্ত প্রশ্ন করেন না। বরং স্বাভাবিক কথাবার্তার মাধ্যমে শিশুকে নিজের মতো করে কথা বলার সুযোগ দেন।
৩. নিজের দিনের গল্প আগে শেয়ার করুন
সন্তানকে কথা বলানোর জন্য সব সময় তার কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার চেষ্টা না করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দেন জেনা।
রাতের খাবারের সময় তিনি প্রথমে নিজের দিনের কোনো মজার বা কঠিন অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এরপর খেলেন ‘রোজবাড থর্ন’ (Rosebud Thorn) নামের একটি খেলা।
এই খেলায়—
রোজ হলো দিনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত,
বাড হলো ভবিষ্যতে যার জন্য অপেক্ষা করছেন এমন কিছু,
থর্ন হলো দিনের এমন কোনো বিষয়, যা ভালো লাগেনি।
জেনার মতে, খেলার মাধ্যমে শিশুরা সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। এতে তাদের মনে হয় না যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
৪. সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
শিশু কোনো বিষয় শেয়ার করলে সঙ্গে সঙ্গে বিচার বা সমাধান দেওয়ার চেষ্টা না করে আগে মন দিয়ে শুনতে হবে। তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করলে সন্তান ভবিষ্যতে আরো সহজে নিজের কথা বলতে আগ্রহী হবে।
৫. প্রতিদিন যোগাযোগের ছোট সুযোগ তৈরি করুন
সন্তানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত—একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা কিংবা কিছু সময় পাশে বসে থাকাও শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের মূল বিষয় হলো শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং তাকে বোঝা এবং নিরাপদ অনুভূতি দেওয়া।
সন্তানকে কথা বলাতে চাপ দেওয়ার পরিবর্তে যদি ধৈর্য, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে পাশে থাকা যায়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সে নিজ থেকেই নিজের ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে শিখবে।