জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দিয়েছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব দেশে বেসরকারি উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা বেসরকারি শোধনাগারে পরিশোধনের পর স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করছেন। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও করছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এ অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এককভাবে সরকার বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সরবরাহ ঝুঁকিও বেড়েছে। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
ভারতজুড়ে রিলায়েন্সের জ্বালানি ব্যবসা
ভারতে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের বড় উদাহরণ Reliance Industries। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, আমেরিকা ও রাশিয়ার বিভিন্ন সরবরাহকারী ও জাতীয় তেল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে।
আমদানি করা অপরিশোধিত তেল সমুদ্রপথে ভারতের গুজরাটের জামনগর রিফাইনারি কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও জটিল এ শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়।
পরিশোধিত এসব পণ্য রিলায়েন্স নিজস্ব ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালিত খুচরা জ্বালানি স্টেশন এবং শিল্প গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। পাশাপাশি পরিবহন বহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছেও সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি রিলায়েন্সের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের চাহিদা, পরিচালন ব্যয় ও প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়।
চীনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি শোধনাগার
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল আমদানিকারক চীনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জ্বালানি ব্যবসায় যুক্ত করেছে। দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
চীন প্রায় ৫০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান Sinopec ও China National Petroleum Corporation-এর পাশাপাশি বেসরকারি শোধনাগারগুলোও আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন করে।
এসব পণ্য চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়। উৎপাদনের পর উদ্বৃত্ত পরিশোধিত জ্বালানি সরকারের নির্ধারিত রপ্তানি কোটার আওতায় সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি করা হয়।
সিঙ্গাপুরে শোধন ও পুনঃরপ্তানি
নিজস্ব কোনো উল্লেখযোগ্য অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত না থাকলেও সিঙ্গাপুর এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যকেন্দ্র। দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য আমদানি করে।
সিঙ্গাপুরের জুরং দ্বীপের বড় শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও ন্যাপথাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। ExxonMobil ও Shell-এর মতো বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি দেশটির শোধন ও জ্বালানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
শোধিত জ্বালানির একটি বড় অংশ প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক বাংকারিং কেন্দ্র হিসেবে আন্তর্জাতিক জাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বেসরকারি কোম্পানির আধিপত্য
দক্ষিণ কোরিয়ার ডাউনস্ট্রিম জ্বালানি তেল বাজারেও বেসরকারি খাতের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। দেশটির চারটি বড় শোধনাগার কোম্পানি অপরিশোধিত তেল আমদানি, পরিশোধন এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে SK Energy, GS Caltex এবং HD Hyundai Oilbank।
এসব কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশের শোধনাগারে পরিশোধন করে। পরে উৎপাদিত পেট্রোল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য নিজস্ব বা সংশ্লিষ্ট বিপণন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা হয়।
‘যার টাকা আছে, নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করবে’
বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি দেব। এজন্য নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এই নীতিমালা সবার জন্য উন্মুক্ত। যার টাকা আছে, সে এই নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করবে।’
মন্ত্রী জানান, বিষয়টি বর্তমানে যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।
সম্প্রতি দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রতিযোগিতা বাড়লে সুফল পাবে অর্থনীতি
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, এককভাবে বিপিসির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো গেলে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প উৎস তৈরি হবে।
বেসরকারি খাত বাজারে প্রবেশ করলে আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও সেবার মানও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ ভূরাজনৈতিক সংকটে আমদানি ঝুঁকি বাড়ে। তাই সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি একাধিক বেসরকারি আমদানিকারক তৈরি করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমদানির মান, মজুত সক্ষমতা, নিরাপত্তা, পরিবহন অবকাঠামো, বাজার তদারকি ও মূল্য নির্ধারণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, স্বচ্ছ নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগানো গেলে জ্বালানি তেলের বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পেতে পারে দেশের শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতি।